প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামগামী আন্তনগর ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ক্যান্টিনে চলন্ত অবস্থায় এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দায়িত্বে থাকা চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাদের পাকশী রেলওয়ে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন সান্তাহার রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল উদ্দীন। তিনি জানান, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় ঘটনার সময় কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে দায়িত্ব পালন করা চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পাকশী রেলওয়ে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের পর অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্টতার মাত্রা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ট্রেনের ক্যান্টিনে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই সময় ৪৪ বছর বয়সী এক নারী ট্রেনের ক্যান্টিনে ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, চলন্ত ট্রেনের ক্যান্টিনে নিয়ে আবু বক্কর সিদ্দিকসহ কয়েকজন তাকে ধর্ষণ করেন।
ঘটনার একপর্যায়ে ভুক্তভোগীর চিৎকার শুনে ট্রেনের অন্য যাত্রীরা বিষয়টি টের পান। তারা দ্রুত ক্যান্টিনের দিকে এগিয়ে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়। পরে যাত্রীরা আবু বক্কর সিদ্দিককে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। এ সময় ট্রেনের ভেতরে আতঙ্ক ও উত্তেজনা তৈরি হয় বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারী নিজেই বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় মোট পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুই পুলিশ সদস্যের নামও রয়েছে। মামলার এজাহারে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতেই এখন তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এবং অভিযোগের প্রতিটি অংশের সত্যতা কী, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। কারণ মামলায় একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এবং তাদের মধ্যে পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। ফলে তদন্তে প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
সান্তাহার রেলওয়ে থানার ওসি দুলাল উদ্দীন বলেন, ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী ঘটনার সঙ্গে পুলিশ সদস্যদেরও জড়িত থাকার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চার পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পাকশী রেলওয়ে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, মামলার পর আবু বক্কর সিদ্দিককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে অন্য অভিযুক্তদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চলন্ত ট্রেনের মতো একটি জনসমাগমপূর্ণ পরিবেশে এমন অভিযোগ ওঠায় ঘটনাটি নিয়ে যাত্রীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাধারণত দূরপাল্লার ট্রেনে যাত্রীরা নিরাপত্তার জন্য রেলওয়ে পুলিশ ও ট্রেনের দায়িত্বশীল কর্মীদের ওপর নির্ভর করেন। সেখানে দায়িত্বে থাকা কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি মামলার বিষয় থাকে না; রেলযাত্রীদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
বিশেষ করে নারী যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি এ ধরনের ঘটনায় নতুন করে সামনে আসে। ট্রেনের ভেতরে কোনো যাত্রী বিপদের মুখে পড়লে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ কতটা কার্যকর, দায়িত্বপ্রাপ্তদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত এবং অভিযোগ পাওয়ার পর কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে অভিযোগ ওঠা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। মামলার এজাহারে যেসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো অভিযুক্তকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা আইনগত ও নৈতিকভাবে সমীচীন নয়। একইভাবে ভুক্তভোগীর অভিযোগকেও যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্তকে তদন্ত প্রক্রিয়ার একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে তদন্ত চলাকালে তাদের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তদন্ত যেন কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপ ছাড়াই সম্পন্ন হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগের পর গ্রেপ্তার হওয়া আবু বক্কর সিদ্দিককে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্য অভিযুক্তদের অবস্থান, ঘটনার সময় তাদের ভূমিকা এবং অভিযোগের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু—এসব বিষয় তদন্তকারীদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি মামলার এজাহারে নাম থাকা দুই পুলিশ সদস্যসহ প্রত্যাহার করা চার সদস্যের ভূমিকা সম্পর্কেও তদন্তে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে ভুক্তভোগীর বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য, ট্রেনের ভেতরের পরিস্থিতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে চলন্ত ট্রেনে সংঘটিত কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল ও সময়সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
রেলপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম দায়িত্ব। তাই এই অভিযোগের তদন্ত শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে ট্রেনে নারী ও সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেটিও পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এদিকে মামলার তদন্তের অগ্রগতি এবং অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে। পুলিশ বলছে, তদন্তে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

