প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে নয় দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। স্থানীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশগ্রহণের সুযোগ বহাল রাখা, নির্বাচনী প্রচারে মন্ত্রী-এমপিদের বিরত রাখা এবং সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনে নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে দলটি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে জামায়াতের একটি প্রতিনিধিদল বৈঠক করে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে দলের অবস্থান ও দাবিগুলো তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে নির্বাচনের মাঠে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, প্রার্থীদের সমান সুযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন জামায়াতের এই নেতা।
মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সরকার নির্বাচনের আগে নিজেদের জন্য মাঠ প্রস্তুত করছে। তার দাবি, নির্বাচনের আগে যেসব প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলে ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে।
এ কারণে প্রশাসকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত। দলটির মতে, নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইতোমধ্যে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চরিত্র ভিন্ন হওয়ায় এখানে প্রার্থী নির্বাচন, স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যাশা ও অভিযোগও কমিশনের সামনে গুরুত্ব পাচ্ছে।
জামায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবির মধ্যে রয়েছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বহাল রাখা। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষকরা যাতে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, সে সুযোগ বন্ধ করা উচিত নয়। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা সীমিত করার বিষয়েও কমিশনের কাছে দাবি জানানো হয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতের উত্থাপিত কয়েকটি দাবি নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে মেনে নিয়েছে। তবে সব দাবি এখনো গ্রহণ করা হয়নি। যেসব বিষয়ে কমিশন এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, সেসব বিষয়ে দলটি তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে বলে জানান তিনি।
তবে নির্বাচন বর্জনের মতো কোনো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি বলেও স্পষ্ট করেছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে। অর্থাৎ দাবি-দাওয়া নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আপাতত নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত দলটির নেই।
তার এই বক্তব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের বর্তমান অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। দলটি একদিকে নির্বাচন কমিশনের কাছে নিরপেক্ষতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থার কথাও বলছে।
তবে একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ওপর সরকারি চাপ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার ভাষ্য, সরকারের চাপের কারণে কমিশনের কিছুটা অসহায়ত্ব রয়েছে। এ অবস্থায় কমিশন যদি জামায়াতের উত্থাপিত দাবিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা না করে, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার বিষয়ে আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা শুধু ভোটগ্রহণের দিনের ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে না। নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক পরিবেশ, প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ, প্রচারণার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের যথাযথ প্রয়োগ এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ—সবকিছু মিলিয়েই একটি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের প্রচারণা থেকে বিরত রাখার দাবিও এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে জামায়াত। দলটির মতে, নির্বাচনী প্রচারণায় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সরাসরি অংশগ্রহণ থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে সমতার পরিবেশ নষ্ট হতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিক সেবা, স্থানীয় উন্নয়ন এবং জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের প্রত্যাশাও থাকে ব্যাপক।
বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ ভোটাররাও চান, নির্বাচনী মাঠে সব প্রার্থী যেন সমান সুযোগ পান এবং প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলো মূলত সেই নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকেই সামনে এনেছে। দলটি মনে করছে, প্রশাসনিক প্রভাব কমানো, সরকারি পদে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনী ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় নির্বাচন আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
বৈঠকে জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতির সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, ১১ দলীয় ঐক্য মূলত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে জোটের শরিকদের সঙ্গে কোনো সংঘাত তৈরি হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তার এই বক্তব্যের ফলে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় ও জোটগত সমীকরণের বিষয়টিও সামনে এসেছে। জাতীয় নির্বাচনে যেসব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে কাজ করেছে, স্থানীয় পর্যায়ে তাদের প্রার্থী ও সাংগঠনিক স্বার্থ সব ক্ষেত্রে এক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন দাবি ও প্রত্যাশা সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কমিশনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর জন্য সমান পরিবেশ নিশ্চিত করা।
জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকে উত্থাপিত দাবিগুলোর বিষয়ে কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিও এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আগ্রহের বিষয়। বিশেষ করে প্রশাসকদের প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনী প্রচারে মন্ত্রী-এমপিদের ভূমিকা নিয়ে কমিশনের অবস্থান সামনে এলে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল আরও পরিষ্কার হতে পারে।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতের নয় দফা দাবি নির্বাচনী পরিবেশ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং প্রার্থীদের সমান সুযোগের প্রশ্নকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা থাকার কথা জানালেও দলটি একই সঙ্গে সতর্ক করেছে—দাবিগুলো উপেক্ষা করা হলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এখন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের সম্ভাব্য প্রার্থী ও ভোটারদের।


