প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত ঐতিহাসিক রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রায় চার বছর ধরে বন্ধ রয়েছে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সিলেট-ছাতক রেলপথ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রেলপথটি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। ফলে কবে নাগাদ এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত মিটারগেজ রেলপথ পুনর্বাসনের জন্য ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। ‘২০২২ সালের বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের (মিটারগেজ ট্র্যাক) পুনর্বাসন প্রকল্প’ নামের এই প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ২৩ আগস্ট শেষ হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের বড় একটি অংশের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
১৯৫৪ সালে সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত রেলপথটি নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই রেলপথ সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, ছাতক অঞ্চলের চুনাপাথর, পাথর, বালি, সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের অন্যান্য এলাকায় পাঠানোর ক্ষেত্রেও রেলপথটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
স্থানীয়দের কাছে এই রেলপথ ছিল অপেক্ষাকৃত কম খরচে নিরাপদ ও সহজ যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। সিলেট শহরের সঙ্গে ছাতক এবং আশপাশের এলাকার মানুষের যোগাযোগেও রেলপথটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেলপথটির বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পুরো রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচল না করায় রেলপথের বিভিন্ন স্থানের স্লিপার ও লোহার পাত চুরির ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে।
রেল যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২০২৫ সালে পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় ওই বছরের ২ জানুয়ারি প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারি অর্থ বা জিওবি এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেড। ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ২১৭ কোটি টাকার বেশি হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ১৯৯ কোটি টাকার চুক্তি করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ সংস্কার, প্রয়োজনীয় মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন এবং নতুন রেললাইন বসানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। এরই মধ্যে ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতাধীন ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে।
তবে রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু এলাকায় কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, ছৈলা-আফজলাবাদ ও সৎপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চী এলাকাতেও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ প্রকল্পের বড় অংশের কাজ শেষ না হওয়ায় নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে রেল চলাচল পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি নিয়ে অবশ্য রেলওয়ে ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। সিলেট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজের দাবি, প্রকল্পের প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাট ও কালভার্ট নির্মাণের কাজও চলছে। তবে প্রকল্পের আরও ৭৫ শতাংশ কাজ এখনো বাকি রয়েছে।
অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, তাঁদের হিসাবে প্রায় ২০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর দাবি, বৃষ্টি ও বর্ষার কারণে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। দেড় বছর মেয়াদি প্রকল্পের মধ্যে দুটি বর্ষাকাল থাকায় সুনামগঞ্জ অঞ্চলের আবহাওয়ার কারণে কাজের গতি ব্যাহত হয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী আমদানি করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আশা, মেয়াদ বাড়ানো হলে অবশিষ্ট কাজ শেষ করে রেলপথটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।
প্রকল্প এলাকার প্রকৌশলী সজিবুর রহমানের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ চলমান রয়েছে। ৫১ হাজার স্লিপার তৈরির কাজ চলছে। মাটির কাজও অব্যাহত রয়েছে। আগামী মাসে ১০টি কালভার্ট নির্মাণের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ছাতকের তিনটি রেলস্টেশন নির্মাণের কাজও চলমান বলে জানান তিনি।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রকল্প শুরুর পর কিছুদিন বিভিন্ন স্থানে কাজের তৎপরতা দেখা গেলেও পরে অনেক এলাকায় কাজের গতি কমে যায়। কোথাও কোথাও কাজ বন্ধ থাকার কারণও তাঁদের কাছে স্পষ্ট নয়। ফলে দীর্ঘদিন পর রেলপথ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ায় যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই হতাশায় পরিণত হয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা উজ্জীবক সুজন তালুকদার বলেন, ২০২২ সালের বন্যার পর থেকেই ট্রেন চলাচল বন্ধ। নতুন করে সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রেলপথ কবে চালু হবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করে ট্রেন চলাচল পুনরায় চালুর দাবি জানান তিনি।
ছাতক প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন রনি বলেন, রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ছাতকের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই রেলপথ শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়, শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ছাতক পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আবুল হাসান বলেন, ছাতকের সিমেন্ট, চুনাপাথর, বালি ও পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে রেলপথটি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের সড়কপথের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বেড়েছে। তাঁর অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম।
রেলপথটির গুরুত্ব শুধু অতীতের যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত নয়; ভবিষ্যতে সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শিল্প ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে রেল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো গেলে সড়কের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ যাত্রীদের জন্যও নিরাপদ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন মূল প্রশ্ন, নতুন করে কত সময় লাগবে এবং অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে কি না। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন অনুমোদিত হলে কাজের নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য কার্যকর পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকির প্রয়োজন হবে।
দীর্ঘ চার বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি ঐতিহাসিক রেলপথের পুনর্বাসন প্রকল্পে যদি বারবার সময় বাড়ে, তাহলে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হবে। তাই প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, অর্থ ব্যয়, কাজের গুণগত মান এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ার কারণগুলো স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
সিলেট-ছাতক রেলপথ ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা এখন একটাই—কাজ যেন আর দীর্ঘসূত্রতায় আটকে না থাকে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এই রেলপথের পুনর্বাসন দ্রুত শেষ করে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হলে শুধু যাত্রীদের যোগাযোগ সুবিধাই ফিরবে না, বরং ছাতকের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পখাতও নতুন গতি পেতে পারে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণে এখন প্রয়োজন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি বাড়ানো এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ শেষ করার কার্যকর উদ্যোগ।


