প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার রাংপানি নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসনের টাস্কফোর্স। অভিযানে অবৈধ বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ১০টি বারকি নৌকা জব্দ করা হয়। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় জব্দ করা নৌকাগুলো বিনষ্ট করা হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১টা পর্যন্ত উপজেলার ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়নের রাংপানি নদীর বিভিন্ন অংশে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রশাসনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ও বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা যৌথভাবে সহায়তা করেন।
অভিযান চলাকালে নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত বারকি নৌকার সন্ধান করা হয়। পরে নদী থেকে এমন ১০টি নৌকা জব্দ করা হয়। স্থানীয়দের উপস্থিতিতে নৌকাগুলো বিনষ্ট করে দেওয়া হয়, যাতে সেগুলো ব্যবহার করে পুনরায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুযোগ না থাকে।
রাংপানি নদী জৈন্তাপুরের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও স্থানীয় পরিবেশব্যবস্থার একটি অংশ। নদী থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলন দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ এবং আশপাশের ভূমির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নদীর তলদেশ থেকে অতিরিক্ত বালু সরিয়ে নেওয়া হলে নদীর তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভাঙনের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এ কারণে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
প্রশাসনের এই অভিযানের ফলে রাংপানি নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত কয়েকটি নৌযান সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদী থেকে অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের জন্যও এটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছে প্রশাসন। নদীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশ রক্ষায় আইন অমান্য করে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অভিযানে বিজিবি ও পুলিশের সদস্যদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। সীমান্তবর্তী এলাকার নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা প্রশাসনের অভিযানকে আরও কার্যকর করেছে। স্থানীয় জনগণও নৌকা বিনষ্ট করার কাজে সহযোগিতা করেন।
জৈন্তাপুরের নদী ও পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। নদী থেকে বালু উত্তোলন একদিকে যেমন নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় উপকরণের জোগান দেয়, অন্যদিকে অনুমোদনহীন ও অতিরিক্ত উত্তোলন পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বৈধ ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে নেওয়া হলে নদীর গভীরতা ও প্রবাহের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, নদীর সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। কারণ কোনো একটি এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু হলে তা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে পারে। একপর্যায়ে নদীর তীরবর্তী জমি, কৃষিজমি কিংবা বসতভিটাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। ফলে শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, অভিযান-পরবর্তী সময়েও সংশ্লিষ্ট এলাকায় নজরদারি অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এ ধরনের টাস্কফোর্স অভিযান অব্যাহত থাকবে। নদী, পরিবেশ ও জনস্বার্থের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ করাই সব ক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান নয়; বরং কোথা থেকে, কতটুকু এবং কীভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও পরিবেশগত বিবেচনা ছাড়া অতিরিক্ত বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই নদী ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন।
রাংপানি নদীতে পরিচালিত সোমবারের অভিযান সেই সমন্বিত উদ্যোগের একটি উদাহরণ। প্রশাসনের নেতৃত্বে বিজিবি ও পুলিশের সহযোগিতায় পরিচালিত অভিযানে অবৈধ কাজে ব্যবহৃত নৌকা জব্দ ও বিনষ্ট করার মাধ্যমে নদী রক্ষায় একটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নদীকে নিরাপদ রাখতে নিয়মিত নজরদারি, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় অভিযান শুধু একটি দিনের কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয়দেরও নদী ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাংপানি নদীর মতো প্রাকৃতিক সম্পদ স্থানীয় মানুষের জন্য শুধু অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবনযাত্রা। তাই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযানকে নদী ও পরিবেশ সংরক্ষণের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।


