প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মিডিয়া সেলের একটি মোবাইল নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিকাশের মাধ্যমে টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার দুপুর থেকে ওই নম্বর ব্যবহার করে পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে অর্থ চাওয়া হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে এবং ওই নম্বর থেকে পাঠানো কোনো আর্থিক দাবি বা প্রলোভনমূলক বার্তায় সাড়া না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সরকারি কার্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি নম্বর ব্যবহার করে এ ধরনের অর্থ দাবি করায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট ও নম্বরটি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতারণার শিকার হয়ে কেউ যেন অর্থ হারিয়ে না ফেলেন, সে জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে সতর্কতামূলক বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহা জানান, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে সংশ্লিষ্ট একটি নম্বর হ্যাক হওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। বিষয়টি জানার পর দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বর্তমানে নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, হ্যাক হওয়া নম্বর থেকে আর্থিক সহায়তার নামে বার্তা পাঠানোর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন এবং কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে না পড়েন, সে জন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
জানা গেছে, যে নম্বরটি হ্যাক হয়েছে সেটি সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মিডিয়া সেলের ব্যবহৃত নম্বর। নম্বরটি হলো ০১৭৩০৩৩১০২২। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় অনেক সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের কাছে নম্বরটি পরিচিত। ফলে হ্যাকাররা এই পরিচিতির সুযোগ নিয়ে সহজেই বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করার চেষ্টা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হ্যাক হওয়ার পর ওই নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বার্তা পাঠানো হয়। বার্তায় জরুরি প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে টাকা পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। এমনকি একজন সাংবাদিকের কাছে পাঠানো একটি বার্তায় জরুরি ভিত্তিতে ১৫ হাজার টাকা পাঠাতে বলা হয়। সেখানে টাকা পাঠানোর জন্য একটি বিকাশ নম্বরও দেওয়া হয়। বিকাশ নম্বরটি ছিল ০১৩৫১২২৪৯৫৫।
সরকারি একটি কার্যালয়ের পরিচিত নম্বর থেকে এ ধরনের বার্তা আসায় অনেকেই প্রথমে বিষয়টি সত্য বলে মনে করতে পারেন। বিশেষ করে কোনো কর্মকর্তা বা পরিচিত ব্যক্তির নামে পরিচালিত নম্বর থেকে জরুরি অর্থের অনুরোধ এলে যাচাই না করেই অনেকে টাকা পাঠিয়ে দিতে পারেন। এ ধরনের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েই প্রতারকরা মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে থাকে।
সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাই স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, হ্যাক হওয়া নম্বর থেকে কোনো ব্যক্তি যদি আর্থিক সহায়তার অনুরোধ পান, তাহলে সেটি কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যাবে না। বার্তার মাধ্যমে টাকা পাঠানোর অনুরোধ, বিকাশ নম্বর দেওয়া কিংবা জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে দ্রুত অর্থ পাঠাতে চাপ দেওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো লেনদেন না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি অপরাধীদের জন্য নতুন ধরনের প্রতারণার সুযোগও তৈরি করেছে। পরিচিত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি দপ্তরের নাম ও নম্বর ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা মানুষের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ পরিচিত পরিচয়ের আড়ালে আসা বার্তাকে অনেকেই স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন।
সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মিডিয়া সেলের নম্বর হ্যাকের ঘটনাটিও সেই ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। একটি সরকারি কার্যালয়ের পরিচিত যোগাযোগ নম্বর ব্যবহার করে অর্থ চাওয়ার ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তাই এ ধরনের কোনো বার্তা পেলে সরাসরি টাকা না পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করা জরুরি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি জানার পরপরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। হ্যাক হওয়া নম্বর পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। পাশাপাশি এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কীভাবে নম্বর বা হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে গেল, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন আরও জানিয়েছে, ঘটনাটি একটি প্রতারণামূলক চক্রের কর্মকাণ্ড হতে পারে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হচ্ছে, যাতে প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সিলেটের বিভিন্ন মহলে সতর্কতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সাংবাদিক ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ব্যক্তিদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ নম্বর ব্যবহার করে টাকা চাওয়ার ঘটনায় অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো পরিচিত নম্বর থেকে অস্বাভাবিক আর্থিক অনুরোধ এলে শুধু নম্বর দেখে সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। হোয়াটসঅ্যাপের মতো যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত নম্বর বা পরিচিত ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট থেকেও প্রতারণামূলক বার্তা আসতে পারে। তাই জরুরি আর্থিক অনুরোধের ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি কথা বলা কিংবা বিকল্প যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কোনো আর্থিক দাবি করা হলে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কারণ সরকারি দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে জরুরি অর্থ পাঠানোর অনুরোধের বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সাধারণ মানুষকে একই ধরনের সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে। হ্যাক হওয়া নম্বর থেকে কোনো বার্তা এলে তাতে সাড়া না দিয়ে বিষয়টি প্রশাসনকে জানাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ধরনের টাকা পাঠানো বা আর্থিক লেনদেন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একটি সরকারি কার্যালয়ের পরিচিত যোগাযোগ নম্বরকে কেন্দ্র করে ওঠা এই অভিযোগ আবারও দেখিয়ে দিল, ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। পরিচিত নম্বর থেকে বার্তা এলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে তথ্য যাচাই করা এবং সন্দেহজনক কোনো অনুরোধে সাড়া না দেওয়াই নিরাপদ। হ্যাক হওয়া নম্বরটি দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এখন প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


