প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ইংরেজি ভাষার চর্চাকে শুধু পাঠ্যবই ও শ্রেণিকক্ষের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে সৃজনশীলতা, উপস্থাপন দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াসে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে পোস্টার ফেস্টিভ্যাল ২০২৬। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের আয়োজনে দিনব্যাপী এই উৎসবে সিলেটের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয় প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ।
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট আয়োজিত এই ফেস্টিভ্যালে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা দলগতভাবে অংশ নেয়। ইংরেজি ভাষায় নিজেদের চিন্তা, কল্পনা, সৃজনশীলতা ও উপস্থাপন দক্ষতাকে পোস্টারের মাধ্যমে তুলে ধরার সুযোগ পায় তারা। প্রতিযোগিতাকে ঘিরে সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছিল শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও অতিথিদের ব্যস্ত উপস্থিতি। প্রতিযোগিতার মঞ্চ থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্য।
আয়োজকদের মতে, ইংরেজি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে প্রচলিত একাডেমিক অনুশীলনের পাশাপাশি সৃজনশীল উপায়ে ভাষা ব্যবহারের সুযোগ শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই ভাবনা থেকেই পোস্টার ফেস্টিভ্যালের আয়োজন। পোস্টারকে এখানে কেবল ছবি বা লিখিত বার্তা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং ভাষা, শিল্প, চিন্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর উপস্থাপনার সমন্বিত একটি সৃজনশীল মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সিলেটে প্রথমবারের মতো এমন আয়োজন হওয়ায় প্রতিযোগী শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছিল বাড়তি আগ্রহ। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রস্তুত করা পোস্টার নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। অভিভাবকরাও আয়োজনটিকে ইংরেজি ভাষাচর্চার একটি ব্যতিক্রমী ও সৃজনশীল উদ্যোগ হিসেবে দেখেছেন। তাদের অনেকের মতে, এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের শুধু ভাষাগত দক্ষতা অর্জনেই সহায়তা করে না, বরং নিজেদের ভাবনা অন্যের সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরার অভ্যাসও গড়ে তোলে।
জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে সকালে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী পর্ব শেষে শুরু হয় মূল প্রতিযোগিতা। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়—এই তিনটি পৃথক ক্যাটাগরিতে শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। প্রতিটি ক্যাটাগরিতে নির্ধারিত পৃথক বিষয়ের ওপর দলগতভাবে পোস্টার তৈরি ও উপস্থাপন করে প্রতিযোগীরা। নিজেদের পোস্টারের বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি বিচারকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় তাদের।
প্রতিযোগিতার এই অংশে শিক্ষার্থীদের কেবল পোস্টারের সৌন্দর্য বা নকশার ওপর নির্ভর করার সুযোগ ছিল না। বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাদের ধারণা, ইংরেজি ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপনের সক্ষমতা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দক্ষতা এবং সৃজনশীল চিন্তার প্রকাশও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে প্রতিযোগিতাটি শিক্ষার্থীদের জন্য একদিকে যেমন সৃজনশীলতার জায়গা তৈরি করে, অন্যদিকে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের বক্তব্য প্রকাশের বাস্তব অভিজ্ঞতাও দেয়।
প্রতিযোগিতা চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা প্রতিযোগিতার বিভিন্ন কক্ষ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকারীদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক তোতিউর রহমান, ব্যবসায় অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. শামসুল আলম, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন মো. খালেদ হোসেন, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান ড. রেজাউল কবীর, আইকিউসির অতিরিক্ত পরিচালক মাহমুদুল হাসান খান এবং সিএসই বিভাগের প্রধান উমর ফারুক জাহাঙ্গীর।
দিনব্যাপী প্রতিযোগিতার বিভিন্ন পর্যায় শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিনি অডিটোরিয়ামে আয়োজন করা হয় পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আশরাফুল আলম। বক্তব্যে তিনি ইংরেজি ভাষায় সৃজনশীলতা প্রকাশের ক্ষেত্রে পোস্টারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শৈল্পিক মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন।
উপাচার্য বলেন, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমের বাইরেও নন্দনচর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ। পোস্টার ফেস্টিভ্যাল সেই ধারাবাহিকতার একটি সফল প্রয়াস। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বে ভাষা ও প্রযুক্তি সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। তাই একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের চিন্তা, উপস্থাপন ও মননচর্চার পথকে আরও সুগম করে।
ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক প্রণবকান্তি দেবের সভাপতিত্বে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন পোস্টার ফেস্টিভ্যালের আহ্বায়ক সহকারী অধ্যাপক স্বাতী রানী দেবনাথ। তিনি আয়োজনের উদ্দেশ্য ও প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার বিকাশ এবং ইংরেজি ভাষার ব্যবহারিক চর্চাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক অনামিকা সাহার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র চন্দ এবং মানবিক অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. শফিউল আলম। তাঁরা শিক্ষার্থীদের এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনে অংশগ্রহণের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রতিযোগিতার বিচারকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন এম. সাইফুর রহমান ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন। প্রতিযোগীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন স্কলার্সহোমের শিক্ষার্থী সম্প্রীতি চক্রবর্তী রাই। বক্তব্য পর্বে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও আয়োজনের তাৎপর্যও উঠে আসে।
শেষপর্যায়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। তিনটি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ব্রিজ একাডেমি, বর্ডার গার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তিনটি দল। বিজয়ীদের পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিটি দলই নিজেদের সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ পায়। ফলে পুরস্কারপ্রাপ্তির বাইরে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাও শিক্ষার্থীদের জন্য হয়ে ওঠে এই আয়োজনের অন্যতম বড় অর্জন।
পোস্টার ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এ সিলেটের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মোট ৩২টি দল অংশ নেয়। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এই উৎসব ইংরেজি ভাষাচর্চাকে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও আনন্দঘন পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দলগত কাজ, সৃজনশীল চিন্তা, গবেষণাধর্মী প্রস্তুতি, ইংরেজিতে বক্তব্য উপস্থাপন এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো দক্ষতা চর্চার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বর্তমান সময়ে শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং নতুন ধারণা উপস্থাপনের দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই বাস্তবতায় এসআইইউর ইংরেজি বিভাগের এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের প্রচলিত শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়ে শেখার একটি বাস্তব ক্ষেত্র তৈরি করেছে। পোস্টারের মতো সহজবোধ্য একটি মাধ্যমকে কেন্দ্র করে ভাষা, শিল্প, প্রযুক্তি ও চিন্তার সমন্বয় ঘটানোয় আয়োজনটি শিক্ষার্থীদের কাছে আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
একটি পোস্টার তৈরির মধ্য দিয়ে একটি ভাবনাকে সংক্ষিপ্ত, আকর্ষণীয় ও অর্থবহভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরার যে দক্ষতা প্রয়োজন, তা ভবিষ্যতের শিক্ষা ও কর্মজীবনেও গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকে পোস্টার ফেস্টিভ্যাল শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের আত্মপ্রকাশ ও আত্মবিশ্বাস তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ভূমিকা রেখেছে। ক্যাম্পাসে দিনভর শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ এবং পুরস্কার বিতরণীর আনন্দঘন পরিবেশ শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ই সামনে এনেছে—ভাষাশিক্ষা যখন সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন শেখার অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত, আনন্দময় ও অর্থবহ।


