প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলকে ঘিরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় নগরীর আরও দুটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে নারী-পুরুষসহ ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হোটেল দুটি সিলগালা করেছে পুলিশ। এ নিয়ে চলতি সময়ে বিভিন্ন অভিযানে সিলেট মহানগরীতে মোট ১৪টি আবাসিক হোটেল সিলগালা করার তথ্য পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ বুধবার (১৯ আগস্ট) বিকেল ও সন্ধ্যায় পৃথক অভিযানে কোতোয়ালি থানার রাজার গলি-দরগাহ গেট এলাকার ‘হোটেল নির্জন’ এবং দক্ষিণ সুরমা থানার কদমতলী এলাকার ‘তিতাস হোটেলে’ অভিযান পরিচালনা করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অভিযানে দুই হোটেল থেকে মোট ১০ জনকে আটক করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বুধবার বিকেল ৫টা ৫ মিনিটের দিকে রাজার গলি-দরগাহ গেট এলাকার হোটেল নির্জনে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে হোটেলটির ষষ্ঠ তলার একটি কক্ষ থেকে চারজনকে আটক করা হয়। পরে একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে দক্ষিণ সুরমার কদমতলী এলাকার তিতাস হোটেলে অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে আরও ছয়জনকে আটক করে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অভিযানের পর দুই হোটেলই সিলগালা করে দেওয়া হয়। এর ফলে আবাসিক হোটেলের আড়ালে কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান তৎপরতার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক হোটেলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সিলেট নগরীর বন্দরবাজার, সুরমা পয়েন্ট, তালতলা, শেখঘাট, রিকাবীবাজার, আম্বরখানা, শাহজালাল (রহ.) দরগাহ গেট, জিন্দাবাজার, সোবহানীঘাট, নাইওরপুল, শিবগঞ্জ এবং দক্ষিণ সুরমার কদমতলী, হুমায়ুন রশীদ চত্বর ও লাউয়াইসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে বিপুলসংখ্যক আবাসিক হোটেল। এসব হোটেলের বড় একটি অংশ বৈধভাবে আবাসিক ও পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে থাকে।
সর্বশেষ দুই হোটেলে অভিযানের আগে চলতি বছরের বিভিন্ন সময়েও একাধিক আবাসিক হোটেলে অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৩ জুন সিলেট মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা নগরীর দুটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে আটক করে। পরে কোতোয়ালি থানার তালতলা এলাকার ‘রহমানিয়া বোডিং’ ও ‘ছাদী গেস্ট হাউজ’ সিলগালা করা হয়। এসব অভিযানের ক্ষেত্রেও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা জানিয়েছিল পুলিশ।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে বন্দরবাজার এলাকার ‘তালহা রেস্ট হাউজে’ অভিযান চালানো হয়। এপ্রিল মাসে লালবাজার এলাকার ‘এলাহী আবাসিক হোটেল’, ‘হোটেল অতিথি’ ও ‘হোটেল সুফিয়া’য় অভিযান পরিচালনা করা হয়। একই ধারাবাহিকতায় গত ২ জুন আম্বরখানা এলাকার ‘নিউ হোটেল লেমন গার্ডেনে’ অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণী ও নারী-পুরুষকে আটক করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট হোটেলগুলো সিলগালা করা হয়।
পুলিশের অভিযান অবশ্য চলতি বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর দক্ষিণ সুরমার ‘সিলেট রেস্ট হাউজ’, তালতলা এলাকার ‘হোটেল বিলাশ’, দক্ষিণ সুরমার ‘গ্রান্ড সাওদা’ ও ‘আল সাদী হোটেলে’ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। সে সময়ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করার পাশাপাশি হোটেলগুলো সিলগালা করা হয়।
একই বছরের নভেম্বরের শুরুতে জিন্দাবাজার এলাকার ‘হোটেল রাজমনীতে’ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করা হয় এবং পরে হোটেলটি সিলগালা করে পুলিশ। এর আগে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি আম্বরখানা এলাকার ‘হোটেল নূরানী’ ও ‘হোটেল আলীবাবায়’ অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই অভিযানে চারজনকে আটক করার কথা জানিয়েছিল পুলিশ।
অভিযানের ধারাবাহিকতা থেকে স্পষ্ট, আবাসিক হোটেলকে কেন্দ্র করে কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে সিলেট মহানগর পুলিশ। একের পর এক হোটেল সিলগালা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আটকের মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটি কঠোর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, কোনো আবাসিক হোটেলে বৈধ ব্যবসার আড়ালে অপরাধমূলক বা অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হলে শুধু সেখানে অভিযান চালানোই যথেষ্ট নয়। হোটেল মালিক, ব্যবস্থাপক কিংবা কর্মচারীদের কেউ যদি জেনেশুনে এমন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করে থাকেন, তদন্তের মাধ্যমে তাদের ভূমিকা নির্ধারণ করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি, হোটেলের নিবন্ধন ও পরিচালনাবিধি যাচাই এবং অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
কারণ, একটি আবাসিক হোটেলের পরিবেশ শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব ফেলে না; আশপাশের বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং সামগ্রিক নগর পরিবেশের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করতে আসা মানুষদের কাছে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল আবাসনব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিলেট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন নগরী হওয়ায় আবাসিক হোটেল খাতের সুনাম ও নিরাপত্তা পর্যটন বিকাশের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানের ফলে একদিকে যেমন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারী হোটেল মালিকদের জন্যও এটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা এবং হোটেলকে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত না করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম জানিয়েছেন, মহানগরীতে অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন হোটেলে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জড়িত হোটেলগুলো সিলগালা করা হচ্ছে।
সর্বশেষ দুই হোটেলে অভিযানের পর নগরজুড়ে আবারও আলোচনায় এসেছে আবাসিক হোটেলকেন্দ্রিক অনিয়মের বিষয়টি। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযান যেন কেবল সাময়িকভাবে হোটেল বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। অভিযোগের প্রকৃত কারণ উদঘাটন, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে নগরীর আবাসিক হোটেল খাতকে আরও নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ করা হবে।
অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মহানগরীতে এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে। ফলে আগামী দিনগুলোতে আরও কিছু হোটেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নগরবাসীর নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি হোটেল মালিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


