সিলেটে দানবাক্সের টাকা নিয়ে সংঘর্ষ, আহত ৩০

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেট মহানগরীর মোগলাবাজার থানাধীন সিলাম এলাকায় মাজার ও মসজিদের দানবাক্সের টাকা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষে সাত পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার (২১ আগস্ট) দুপুর ১টার দিকে চকের বাজার হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) জামে মসজিদ ও ঈদগাহের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

সংঘর্ষের ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে দুই পক্ষের হামলা-পাল্টাহামলার মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হন। পরে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের সহযোগিতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সংঘর্ষের পর এলাকায় নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) ওয়াকফ এস্টেটের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিলাম শেখপাড়া এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এরই মধ্যে শুক্রবার মসজিদে নামাজ পড়তে আসা লোকজনের মধ্যে দানবাক্স বা ক্যাশ বাক্সের টাকা নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে সেই বাকবিতণ্ডা উত্তপ্ত হয়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরে উভয় পক্ষের লোকজন ইটপাটকেল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, শুরুতে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা হলেও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দুই পক্ষের লোকজন পরস্পরের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। সংঘর্ষের খবর পেয়ে মোগলাবাজার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হামলা-পাল্টাহামলার মধ্যে মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেনসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন।

সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে শেখপাড়া গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি এবং হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) জামে মসজিদের মোতাওয়াল্লী ফজলু মিয়া, শুয়েব আহমদ, আরিফুল হক রনি ও লতিফুর রহমান মেহদির নাম জানা গেছে। অন্য আহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। আহতদের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মসজিদের ক্যাশ বাক্সের টাকা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশ সদস্যরাও আহত হয়েছেন।

প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষের কারণে চন্ডিপুল-বালাগঞ্জ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আসার পর ধীরে ধীরে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বিরোধের পেছনে শুধু তাৎক্ষণিক দানবাক্সের টাকা নিয়ে বিরোধ নয়, ওয়াকফ এস্টেট পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বও রয়েছে। ফলে মসজিদের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সামান্য একটি মতবিরোধ দ্রুত বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নেয়।

হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানি (রহ.) মাজার ওয়াকফ এস্টেট পরিচালনা নিয়ে বিরোধের একটি প্রশাসনিক ও আইনি প্রেক্ষাপটও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাজার ওয়াকফ এস্টেটের নিবন্ধন নম্বর ১২৭৩৫। গত ২৯ জুলাই ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মাজার ওয়াকফ এস্টেট পরিচালনার জন্য নয় সদস্যের একটি কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

অনুমোদিত ওই কমিটিতে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিককে সভাপতি এবং দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সহসভাপতি করা হয়। মো. ফজলু মিয়াকে মোতাওয়াল্লী এবং আবেদ রাজা ও আহমদুর রহমান ছাদেককে যুগ্ম মোতাওয়াল্লী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কমিটিতে আরও কয়েকজনকে সদস্য করা হয়।

এই কমিটি অনুমোদনের পর বিষয়টি নিয়ে আইনি বিরোধ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শাহ আব্দুল মান্নান এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেন। গত ১৬ আগস্ট হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে রিটটির শুনানি হয়। শুনানি শেষে ওয়াকফ প্রশাসনের অনুমোদিত কমিটি বহাল রাখা হয় বলে জানা গেছে।

তবে আদালতের নির্দেশনায় সাময়িক সময়ের জন্য ওই কমিটির মোতাওয়াল্লী ফজলু মিয়ার কার্যক্রম স্থগিত করে মাজার ওয়াকফ এস্টেট ও মসজিদের দায়িত্ব পালনের জন্য আবেদ রাজাকে দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে আদালতের সিদ্ধান্তের পর ওয়াকফ এস্টেটের দায়িত্ব ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটেই শুক্রবার মসজিদের দানবাক্সের টাকা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ওয়াকফ সম্পত্তির অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ায় ঘটনাটি দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরাও আহত হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিরোধ কোনোভাবেই সহিংসতায় গড়ানো উচিত নয়। দানবাক্সের অর্থ কিংবা ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সেই বিরোধ সংঘর্ষে রূপ নিলে সাধারণ মুসল্লি, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য—সব পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়েন।

বিশেষ করে ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। দানবাক্সের অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে তা গণনা করা হয়, কারা এর হিসাব রাখেন এবং কোন খাতে ব্যয় করা হয়—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ব্যবস্থাপনা থাকলে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি ও বিরোধ এড়ানো সম্ভব। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকায় এ ধরনের ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে সংঘর্ষের পর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।

ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কও দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সংঘর্ষ চলায় অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হয়।

সব মিলিয়ে, একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দানবাক্সের অর্থ নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এতে সাত পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হওয়ার ঘটনা স্থানীয় বিরোধকে দ্রুত সহিংসতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিই সামনে এনেছে। দীর্ঘদিনের ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিরোধের স্থায়ী ও আইনসম্মত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের উত্তেজনা ফের তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আইনগত সিদ্ধান্ত কার্যকর করার বিষয়টিকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি সিলেটের যে এমপি

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইংরেজি সৃজনশীলতায় এসআইইউর পোস্টার ফেস্টিভ্যাল

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ধানমন্ডি ৩২: ইউনূসসহ ২৭ জনের মামলা খারিজ

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে আরও দুই আবাসিক হোটেল সিলগালা

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মন্ত্রিসভায় চার নতুন মুখ, দপ্তরেও আসছে রদবদল

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি সিলেটের যে এমপি

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইংরেজি সৃজনশীলতায় এসআইইউর পোস্টার ফেস্টিভ্যাল

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ধানমন্ডি ৩২: ইউনূসসহ ২৭ জনের মামলা খারিজ

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে আরও দুই আবাসিক হোটেল সিলগালা

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মন্ত্রিসভায় চার নতুন মুখ, দপ্তরেও আসছে রদবদল

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটের দুই তরুণীর ৭৫ লাখ টাকার বৃত্তি

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মির্জা ফখরুলকে জারদারির অভিনন্দন

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

স্বাক্ষর নিতে গিয়ে ধরা পড়ল জাল জন্মনিবন্ধন

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ