প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার নিকুঞ্জ ভিলায় বৃদ্ধ দম্পতি ও গৃহপরিচারিকা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার বাবুল মিয়ার চার দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে সম্মতি জানিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। আদালতের নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে তার জবানবন্দি গ্রহণের কথা রয়েছে। এ ঘটনায় তদন্তের পরবর্তী ধাপ এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিয়ে নতুন করে মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির জানান, চার দিনের রিমান্ড শেষে বাবুল মিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তিনি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছেন। তাকে আদালতের সামনে জবানবন্দি দেওয়ার জন্য উপস্থাপন করা হবে।
আইনজীবী অ্যাডভোকেট মইনুল হক বুলবুল জানান, রিমান্ড শেষে বাবুল মিয়াকে আদালতে আনা হয়। পরে বেলা ১টার দিকে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে তাকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার খাস কামরায় নেওয়া হয়। বিকেলের দিকে তার জবানবন্দি গ্রহণের কথা রয়েছে।
তবে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার সম্মতি জানানো এবং ইতোমধ্যে জবানবন্দি দেওয়া এক বিষয় নয়। আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তার বক্তব্য রেকর্ড হওয়ার কথা। ফলে তার জবানবন্দিতে কী তথ্য উঠে আসে, সেটিই এখন তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর আগে গত রোববার (১৬ আগস্ট) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেই রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার তাকে আবার আদালতে হাজির করা হয়।
গত ১২ আগস্ট সকালে সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা নিকুঞ্জ ভিলা থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন বাসার মালিক আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং তাদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়। মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
ঘটনার পরপরই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। একটি আবাসিক ভবনের ভেতরে একই সঙ্গে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে এবং আশপাশের তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে সন্দেহভাজনদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে।
পুলিশের দাবি, ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার একটি কলোনি থেকে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ওই এলাকায় পরিচিত ছিলেন এবং এর আগে নিহতদের বাসায় রংমিস্ত্রির কাজ করেছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। তবে তদন্তের স্বার্থে তার বক্তব্য ও অন্যান্য আলামত যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার পূর্বপরিচয় ছিল। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনার দিন সকালে বাবুল ওই বাসায় প্রবেশ করেন। এরপর তাহমিনার সঙ্গে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয় বলে পুলিশের দাবি। তার চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও আঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ নিয়ে শুরু থেকেই একাধিক তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের সম্পর্ক এবং তা ঘিরে বিরোধের কথা বলা হলেও নিহত আব্দুস সাত্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে অন্য একটি সম্ভাবনার কথা মামলার অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা থানায় দেওয়া অভিযোগে জমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ করেছেন। এ কারণে তদন্তে একাধিক সম্ভাব্য কারণ যাচাই করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া অভিযোগে একটি ভূমি-সংক্রান্ত মামলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের পাশাপাশি পরিবারের অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে। কোনটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
ঘটনার পরদিন ১৩ আগস্ট পুলিশ বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছোরা উদ্ধারের কথা জানায়। অস্ত্র উদ্ধারের এই তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তথ্য এবং প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের ফলও তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে নিহত আব্দুস সাত্তার ছিলেন সিলেটের ব্যবসায়ী মহলে পরিচিত ব্যক্তি। তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন এবং একসময় কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করায় স্থানীয়দের কাছেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমও দীর্ঘদিন ধরে ওই বাসায় বসবাস করতেন। তাদের সন্তানদের কয়েকজন বিদেশে বসবাস করেন। ফলে আকস্মিক এই হত্যাকাণ্ড পরিবারের সদস্যদের জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিহত দম্পতির জানাজা গত ১৪ আগস্ট সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়। স্বজনেরা দেশে ফিরে মরদেহ গ্রহণ করেন। অন্যদিকে গৃহপরিচারিকা তাহমিনার মরদেহও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তদন্তের এই পর্যায়ে বাবুল মিয়ার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিকে ঘিরে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। আদালতে তিনি কী বলেন, হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে তার বক্তব্য কী এবং ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য তিনি দেন কি না—এসব বিষয় এখন তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে আদালতে দেওয়া বক্তব্যের পাশাপাশি তা অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগ এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে। ফলে বাবুল মিয়ার জবানবন্দির পর তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং নিকুঞ্জ ভিলার তিন হত্যার নেপথ্যে আসল কারণ কী ছিল, সেটিই এখন সিলেটবাসীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।


