প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব ও শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্য আহতদের হবিগঞ্জ জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার দিবাগত মধ্যরাতে হবিগঞ্জ শহরের অনন্তপুর আবাসিক এলাকায় অবস্থিত মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পর হোস্টেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাতের কোনো এক সময়ে হোস্টেলে তাফসির ও শরীফ উদ্দিনের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জানান, তাঁদের মধ্যে আগে থেকেই অভ্যন্তরীণ বিরোধ ছিল। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ের সেই বিরোধ ছড়িয়ে পড়ে অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও। পরে দুই পক্ষের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
সংঘর্ষের সময় লোহার রড, ক্রিকেটের স্টাম্পসহ বিভিন্ন দেশীয় সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। হোস্টেলের ভেতরে হঠাৎ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন অন্য শিক্ষার্থীরাও। পরে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাসরিফ আহমেদ, শরীফ উদ্দিন, রায়হান রাজ, রজব সানি, ফারদিন ইফতি, সামি, রিয়াদ, আব্দুল্লাহ চৌধুরী, সামিউল আল আরিফ ও হুজাফ সৌমির নাম জানা গেছে। আহত অন্যদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
হবিগঞ্জ জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালের চিকিৎসক রেজাউল করিম জানান, সংঘর্ষের পর আহত কয়েকজন শিক্ষার্থী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাঁদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
তবে সংঘর্ষের কারণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে। এক পক্ষের শিক্ষার্থীরা ঘটনাটিকে মূলত সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব এবং দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধের ফল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, কথাকাটাকাটিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
অন্যদিকে আহত এক পক্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী দাবি করেছেন, ঘটনাটি শুধু সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, শিবিরের কয়েকজন শিক্ষার্থী হামলা চালিয়ে ছাত্রদল-সমর্থিত শিক্ষার্থীদের আহত করেছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ এবং কারা প্রথম হামলা চালিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ঘটনার পর মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। রাতের ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। চিকিৎসাশিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পরিবেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় কলেজের স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষার্থীরা সাধারণত দীর্ঘ সময় হোস্টেলে একসঙ্গে বসবাস করেন। একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মতপার্থক্য বা ব্যক্তিগত বিরোধ তৈরি হলেও তা যেন সংঘর্ষে রূপ না নেয়, সে জন্য পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ থাকা জরুরি। বিশেষ করে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হওয়ার কারণে সহনশীলতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হক বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষের পেছনে কী কারণ ছিল, কারা এতে জড়িত এবং কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় না ঘটে, সে বিষয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত প্রশমিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, সংঘর্ষের প্রভাব শুধু আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এতে শিক্ষা কার্যক্রম, হোস্টেলের স্বাভাবিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি উঠেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিরপরাধ কোনো শিক্ষার্থী যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর দেওয়ার দাবি রয়েছে।
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে এর আগে এমন কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে কি না, কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বুধবার রাতের ঘটনায় নতুন করে হোস্টেলের নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে।
বর্তমানে আহতদের চিকিৎসা চলছে এবং পুলিশ ঘটনার বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত শেষ হলে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাবে। তার আগে কোনো পক্ষের অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে আইনগত তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করাই হবে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।


