প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘ দুই যুগ পর অস্ট্রেলিয়ার কঠিন মাটিতে ঐতিহাসিক এক টেস্ট সিরিজ খেলার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। ২০০৩ সালের পর এই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটের লড়াইয়ে নামতে চলেছে টাইগাররা। অজিদের শক্তিশালী ও বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে তাদের চিরচেনা বাউন্সি উইকেটে লড়াই করা যে কতটা রোমাঞ্চকর ও চ্যালেঞ্জিং হবে, তা নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘদেহী ও গতিময় পেসারদের অতিরিক্ত বাউন্স এবং পেস সামলানোই আসন্ন ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটারদের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা হতে চলেছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তবে অতীতের সমস্ত ব্যর্থতা ও প্রস্তুতির ঘাটতির শঙ্কাকে পেছনে ফেলে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী ও ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামার জন্য দল এখন পুরোপুরি প্রস্তুত বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন টাইগার দলপতি।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা রাখার পর মূল লড়াইয়ে নামার আগে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ দল। কিন্তু সেই প্রস্তুতি ম্যাচে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে পড়ে মাত্র ৫৪ রানেই অলআউট হয়ে যাওয়ার অনভিপ্রেত ঘটনা দেশের ক্রিকেটপ্রেমী ও ভক্তদের মাঝে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল। এত অল্প রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছিল দলের ব্যাটিং সামর্থ্য এবং পেস বোলিং মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে। তবে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ওই প্রস্তুতি ম্যাচের বিচ্ছিন্ন ও ব্যর্থ পারফরম্যান্স নিয়ে একবিন্দুও বিচলিত হতে নারাজ। ম্যাচ শুরুর ঠিক আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে দলের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, প্রস্তুতি ম্যাচের ওই খারাপ দিনটিকে তারা পেছনে ফেলে সামনে তাকাতে চান। কারণ, প্রস্তুতি ম্যাচ মানেই হলো মূল লড়াইয়ের আগে নিজেদের ভুলত্রুটিগুলো শোধরে নেওয়ার একটি সুযোগ, আর সেই সুযোগটিকেই দলীয় খেলোয়াড়েরা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন।
ডারউইনের কন্ডিশন ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ দল বেশ কিছুদিন আগেই অস্ট্রেলিয়ায় এসে পৌঁছায়। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দশ-বারো দিন আগে ডারউইনে পা রাখতে পারার কারণে এখানকার পরিবেশ, আবহাওয়া এবং উইকেটের মরণঘাতী বাউন্স সম্পর্কে দলের ক্রিকেটাররা মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে যথেষ্ট ভালো ধারণা নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে বলে জানান শান্ত। তিনি উল্লেখ করেন যে, অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে নামলে উইকেটের বাড়তি বাউন্স থাকবেই, এটি ক্রিকেটের চিরন্তন একটি বাস্তবতা। তবে এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই গত কয়েক মাস ধরে দেশের মাটিতে বিশেষ করে বাউন্সি উইকেটে নিবিড় অনুশীলন ও প্রস্তুতি সেরে এসেছে টাইগাররা। ঘরের মাঠে সেই বিশেষ অনুশীলনের অভিজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের মানিয়ে নিতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দীর্ঘ সময় ধরে ডারউইনে অবস্থান করায় এখানকার পিচের আচরণ বুঝতে সুবিধা হয়েছে, যা মূল টেস্ট ম্যাচে দলের ব্যাটসম্যানদের বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
অস্ট্রেলিয়া দলের বোলিং আক্রমণ যে বিশ্বমানের এবং তাদের পেসাররা যে যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে, তা অকপটে স্বীকার করে নেন অধিনায়ক। বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ও গতিময় বোলিং লাইনআপের মুখোমুখি হওয়া সহজ নয় জেনেই বাংলাদেশ দল দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তবে এই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখেও দলের প্রস্তুতি নিয়ে অধিনায়ক পুরোপুরি সন্তুষ্ট। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, অতীতেও বহুবার অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে দল ভালো করতে পারেনি, আবার মূল লড়াইয়ে ঠিকই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। ক্রিকেট ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রস্তুতি ম্যাচগুলোর মূল উদ্দেশ্যই থাকে বিভিন্ন কমতি খুঁজে বের করা এবং সেগুলোকে শুধরে নেওয়া। তাই ওই একটি মাত্র খারাপ দিন বা প্রস্তুতি ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়ে পুরো দলের সামর্থ্য বা প্রস্তুতিকে মাপা বোকামি হবে। দল মানসিকভাবে চাঙ্গা রয়েছে এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজেদের সেরাটা নিংড়ে দেওয়ার জন্য সবাই মুখিয়ে আছে।
ব্যাটিং ইউনিটের সামনে যে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করছেন না অধিনায়ক শান্ত। বিশেষ করে ম্যাচের প্রথম ইনিংসে নতুন বলের মোকাবিলা করা এবং পেসারদের সুইং ও অতিরিক্ত বাউন্স সামলানো অত্যন্ত দুরূহ হবে। এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে দলের ব্যাটাররা নিয়মিতভাবে অনুশীলন করে যাচ্ছেন এবং নিজেদের টেকনিক শানিয়ে নিচ্ছেন। অধিনায়ক হিসেবে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, কোনো অপ্রয়োজনীয় চাপ না নিয়ে প্রতিটি ব্যাটারকে উইকেটে থিতু হয়ে নিজের স্বাভাবিক ও সহজাত খেলাটিই উপহার দিতে হবে এবং দলের স্কোরে রান যোগ করার দায়িত্ব নিতে হবে। টেস্ট ক্রিকেটের লম্বা ফরম্যাটে টিকে থাকতে হলে রক্ষণ ও আক্রমণের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যা দলের খেলোয়াড়েরা ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছেন।
দীর্ঘ দুই দশকের দীর্ঘ অপেক্ষা ঘুচিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এই টেস্ট মিশন শুধু একটি সাধারণ সিরিজ নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের টেস্ট মর্যাদাকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে পুরো দল এখন যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত। অজিদের পেস আক্রমণ এবং মাঠের বাইরের সমস্ত চাপকে পাশ কাটিয়ে টাইগাররা যদি নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী মাঠে লড়তে পারে, তবে ডারউইনের মাটিতে একটি স্মরণীয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টেস্ট ম্যাচ উপহার দেওয়া সম্ভব হবে। সমগ্র দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশা, সব চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে বাংলাদেশ দল তাদের সেরা নৈপুণ্য প্রদর্শন করবে এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে লাল-সবুজের পতাকা গর্বের সঙ্গে উড্ডীন করবে।


