প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের নামে সংঘটিত নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধের ঐতিহাসিক ও চাঞ্চল্যকর মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতার সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘ যুক্তিপ্রদর্শন ও তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের শেষ পর্যায়ে এসে রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর এই কঠোর শাস্তির দাবি জানান। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে শত শত প্রাণহানি ও বহু মানুষকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার নেপথ্যে এই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সরাসরি প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র ও হুকুমের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে যে, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনুকম্পা প্রদর্শনের সুযোগ নেই।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিশিষ্ট বিচারিক প্যানেলের সামনে এই যুক্তিতর্ক সমাপ্ত করা হয়। বিচারিক প্যানেলের অপর সম্মানিত সদস্যরা হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে, ইতিহাসের নজিরবিহীন এই মামলায় অভিযুক্ত সাত আসামির প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই আনা সুনির্দিষ্ট চারটি গুরুতর অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। চব্বিশের উত্তাল দিনগুলোতে নিরপরাধ ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা এবং বহু মানুষকে আহত করার পেছনে এই আসামিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্ব ছিল। তাই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি বা দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি এই স্বাধীন ভূমিতে আর কখনো না ঘটে।
এর আগে টানা ষষ্ঠ কার্যদিবসের মতো রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তাঁর যুক্তি উপস্থাপন শেষে চিফ প্রসিকিউটর নিজের সমাপনী বক্তব্য তুলে ধরেন। প্রসিকিউশনের সামগ্রিক যুক্তি উপস্থাপন পর্ব শেষ হওয়ার পর পলাতক আসামিদের পক্ষে আদালত কর্তৃক সরকারি খরচে নিযুক্ত রাষ্ট্রীয় আইনজীবী এম হাসান ইমাম তাঁর নির্ধারিত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, মঈনুল করিম, তারেক আবদুল্লাহসহ প্রসিকিউশন টিমের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ, যাঁরা পুরো বিচারিক প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত ৪ আগস্ট থেকে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল। প্রথম দিন থেকেই প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম পর্যায়ক্রমে টানা পাঁচ কার্যদিবসে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে উঠে আসা বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য, অডিও-ভিডিও ক্লিপ ও ফোনালাপের রেকর্ড আদালতে উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে আন্দোলন কঠোর হাতে দমনের জন্য এই শীর্ষ নেতারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং সমন্বিত উপায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন। সাধারণ ছাত্র ও মুক্তিকামী জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন প্রতিহত করতে দলীয় ক্যাডারদের রাজপথে নামিয়ে সশস্ত্র হামলা চালানোর আহ্বান জানানো হয় বিভিন্ন বৈঠকে। কোথাও কোথাও সহিংসতার নীল নকশা বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হিসেবে সেই সময়ের সংগৃহীত ফোনালাপ বা কল রেকর্ড ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। পাশাপাশি, আন্দোলন দমনের স্বার্থে গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরা এবং সংবাদ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের নেপথ্যেও এই আসামিদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকার কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করেন প্রসিকিউশন। আসামিদের এহেন হঠকারী ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতাতেই দেশজুড়ে হত্যা, নির্বিচারে হত্যাচেষ্টা এবং মানবতাবিরোধী ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনাগুলো ঘটেছিল।
এই চাঞ্চল্যকর মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া অভিযুক্ত অপর শীর্ষ নেতারা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। মামলার শুরু থেকেই এই সাত আসামি গ্রেপ্তার এড়িয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দৃষ্টির আড়ালে পলাতক রয়েছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সহ রাষ্ট্রপক্ষের বিভিন্ন স্তরের সাক্ষ্যদান পর্ব অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে গত গত ২ আগস্ট এই আলোচিত মামলাটিতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষী রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন, যা আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে।
চলতি বছরের গত ২২ জানুয়ারি এই সাত আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এরও আগে বিগত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দাখিল করা ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল আমলে নিয়েছিল। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে এখন রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের সর্বোচ্চ শান্তির দাবি জানানোর মধ্য দিয়ে মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। চব্বিশের জুলাই-আগস্টের শহীদ পরিবার এবং আহত ছাত্র-জনতা দীর্ঘদিন ধরে এই ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত কুশীলবদের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অপেক্ষায় দিন গুনছেন। আদালতের রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আইনের শাসন সমুন্নত থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর।


