প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো যখন নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও মুক্তচিন্তার সহাবস্থান নিশ্চিত করার কথা বলছে, ঠিক তখন ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন মতাদর্শের ছাত্রসংগঠনগুলোর পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে বহিরাগতদের নিয়ে র্যালি করাকে কেন্দ্র করে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ন্যাক্কারজনক সংঘর্ষের ঘটনায় উভয়পক্ষের অন্তত দশজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। গত বুধবার (৫ আগস্ট) সকালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত একাডেমিক ও প্রশাসনিক চত্বরে এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যা দ্রুত সময়ের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় রূপ নেয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি এবং সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে বুধবার সকালে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ‘অদম্য জুলাই’ শীর্ষক একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও করিডোর প্রদক্ষিণ করার সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কিছু বহিরাগত বহুল আলোচিত মুখ ও রাজনৈতিক কর্মী উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ঠিক সেই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং র্যালিতে বহিরাগতদের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রকাশ্য আপত্তি তোলেন। এই আপত্তি জানানোর সূত্র ধরেই প্রথমে উভয় সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও কথাকাটাকাটি শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, সামান্য কথা কাটাকাটি রূপ নেয় হাতাহাতি এবং পরবর্তীতে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।
সংঘর্ষের প্রাথমিক পর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিভাগের করিডোর এবং প্রশাসনিক ভবন চত্বরে এক ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রাণভয়ে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি শুরু করেন এবং অনেককে শ্রেণিকক্ষে বা আবাসিক হলের রুমে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করতে দেখা যায়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত হানাহানির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক একাডেমিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রক্টরিয়াল টিম এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান, তবে তার আগেই উভয় পক্ষের ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিসোটা ব্যবহারের কারণে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর জখম হন।
এই সংঘর্ষের ঘটনার পর উভয় সংগঠনের শীর্ষ নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আশিক আহমেদ গণমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন যে, ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার অসৎ উদ্দেশ্যে বহিরাগত লোকজনকে ডেকে এনে লাঠিসোটার সঙ্গে দলীয় ও জাতীয় পতাকা বেঁধে ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেছিল। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় তাদের অনুরোধ করা হয়েছিল যেন কোনো ধরনের বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করিয়ে নিজস্ব শিক্ষার্থীদের নিয়ে কর্মসূচি পালন করা হয়। কিন্তু ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সেই যৌক্তিক অনুরোধ তো তোয়াক্কা করেনি, বরং উল্টো ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিতভাবে চড়াও হয় এবং হামলা চালায়। এই আকস্মিক হামলায় ছাত্রদলের অন্তত পাঁচ থেকে ছয়জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, এই ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া ইসলাম বাবু দৃঢ় দাবি করেন যে, তারা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলিতভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে পূর্বনির্ধারিত ‘অদম্য জুলাই’ কর্মসূচি পালন করছিলেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে শান্তিপূর্ণভাবে র্যালিটি যখন ভিসি গেটের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে বিনা উসকানিতে ছাত্রদলের একদল নেতাকর্মী পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এই হামলায় ছাত্রশিবিরের অন্তত পাঁচজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। জাকারিয়া ইসলাম বাবু আরও অভিযোগ করে বলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল প্রক্টর এবং প্রক্টরিয়াল বডির প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রক্টর মহোদয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সামান্য চেষ্টা চালালেও হামলাকারীদের আগ্রাসন থামানো যায়নি। এই ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র বিচার দাবি করে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ইতিমধ্যে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন বলে জানান।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ ধরনের ছাত্ররাজনীতির নামে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সচেতন অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের পর যখন দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে একটি গণতান্ত্রিক, নিরাপদ এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠার সোনালী সময় এসেছে, ঠিক তখন নিজেদের দলীয় আধিপত্য ও শক্তি প্রদর্শনের জন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর এই ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বপ্নকে আবারও পদদলিত করছে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে এই ধরনের হানাহানি কঠোরহস্তে দমন করা উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন তারা।
ঘটনার পর সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) বেলাল হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বর্তমানে ক্যাম্পাসের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত যেকোনো ধরনের সহিংসতা এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার এবং ক্যাম্পাসের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত থাকলেও দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যকার এই দ্বন্দ্বের ফলে ক্যাম্পাসের বাতাস এখনো বেশ ভারী ও থমথমে হয়ে রয়েছে।

