প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের নাটকীয় ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় হিসেবে খোদাই হয়ে আছে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের পতনহীন ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে চরম উৎকণ্ঠা ও জনরোষের মুখে হেলিকপ্টার ও সামরিক পরিবহণ বিমানে করে দেশ ছেড়ে পালানোর সেই রোমহর্ষক যাত্রার পেছনের নেপথ্য কাহিনী এবং এর সঙ্গে জড়িত নানা খুঁটিনাটি বিষয় আজও সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। গণভবন থেকে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি হয়ে ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত কৌশলগত হিন্দন বিমানঘাঁটি পর্যন্ত দীর্ঘ এই আকাশপথের যাত্রায় ঠিক কোন পাইলট ও সামরিক কর্মকর্তারা বিমান পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন এবং বর্তমান সময়ে তারা কোথায় ও কোন দায়িত্বে কর্মরত আছেন—তা নিয়ে দেশজুড়ে নানা কৌতূহল ও জল্পনা-কল্পনার অন্ত নেই। যদিও এই ঐতিহাসিক ও স্পর্শকাতর ফ্লাইট পরিচালনা এবং এর নেপথ্য কৌশল নিয়ে বাংলাদেশ সরকার, সশস্ত্র বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কোনো কর্র্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অদ্যাবধি কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা বিস্তারিত শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়নি, তবুও সামরিক সূত্র এবং বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী তথ্যের ভিত্তিতে সেই ঐতিহাসিক ফ্লাইটের পেছনের অজানা অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।
অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্বে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সেই ঐতিহাসিক দুপুরের কথা স্মরণ করলে আজও শিহরণ জাগে। যখন রাজধানী ঢাকার রাজপথ হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার মিছিলে প্রকম্পিত এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের রক্তে রঞ্জিত, ঠিক সেই ভরদুপুরে দেশের আকাশসীমা ত্যাগ করে পলায়ন করছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। জনরোষ থেকে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে সামরিক হেলিকপ্টার ও বিমানের অত্যন্ত উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাময় সেই যাত্রার সময় তার মানসিক অভিব্যক্তি কেমন ছিল, বিমানে বসা অবস্থায় তিনি তার সহযাত্রী, ঘনিষ্ট ক্রু কিংবা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের উদ্দেশ্যে ঠিক কী ধরনের নির্দেশ বা মন্তব্য করেছিলেন, অথবা যে দক্ষ পাইলট ও কর্মকর্তারা তাকে অত্যন্ত সুকৌশলে এবং নিরাপদে ভিন দেশের মাটিতে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তারা পরবর্তীতে কোথায় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন—এই সমস্ত প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর খুঁজতে বিভিন্ন সময় মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে গণমাধ্যম।
সামরিক সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে গণভবন থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিশেষ এমআই-১৭ হেলিকপ্টারটি উড্ডয়ন করেছিল। ওই অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হেলিকপ্টারটির পাইলট বা প্রধান চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন অভিজ্ঞ বিমান কর্মকর্তা এয়ার কমোডর আব্বাস এবং তার সহকারী বা কো-পাইলটের দায়িত্বে ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির। চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হেলিকপ্টারটি চালিয়ে তারা ঢাকার আকাশসীমা অতিক্রম করেন এবং একই দিন বিকেল আনুমানিক তিনটার দিকে সেটিকে কুর্মিটোলা এয়ার বেইজের নির্ধারিত টার্মিনালে নিরাপদে অবত করাতে সক্ষম হন।
পরবর্তী সময়ে এই ঘটনার রেশ ধরে সামরিক ও প্রশাসনিক রদবদলের অংশ হিসেবে হেলিকপ্টারটির প্রধান পাইলট এয়ার কমোডর আব্বাসকে একটি বিশেষ ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট সেই সামরিক কোর্স வெற்றাবশেষে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী সদর দপ্তরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এয়ার হেডকোয়ার্টার ইউনিটের অধিনায়ক হিসেবে নিজের নিয়মিত দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি এই পদেই বহাল থেকে নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, ওই একই হেলিকপ্টারের কো-পাইলটের দায়িত্বে থাকা গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির বর্তমানে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাশার এয়ার বেইজে অফিসার কমান্ডিং (ওসি অ্যাডমিন) হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে তার প্রশাসনিক ও সামরিক দায়িত্ব পালন করছেন।
কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে অবতরণের পর পরিস্থিতি এতটাই দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল যে সেখানে আগে থেকেই ইঞ্জিন পুরোপুরি চালু এবং প্রস্তুত অবস্থায় একটি ভারী সি-১৩০ জুলিয়েট সামরিক পরিবহণ বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে পৌঁছানোর পর শেখ হাসিনা তৎক্ষণাৎ সেই সামরিক পরিবহণ বিমানে আরোহণ করেন এবং ভারতের উদ্দেশে চূড়ান্ত আকাশযাত্রা শুরু করেন। সামরিক সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে যে, ওই সুদীর্ঘ আন্তর্জাতিক সামরিক পরিবহণ বিমানের প্রধান পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এয়ার কমোডর শামীম রেজা এবং কো-পাইলট হিসেবে তাকে সার্বিক সহায়তা দিয়েছিলেন উইং কমান্ডার মাহফুজ। চরম গোপনীয়তা ও নিখুঁত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে পরিচালিত সেই বিমানযাত্রা শেষে ৫ আগস্ট সন্ধ্যার দিকে, ঠিক সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটের সময়, ভারতের দিল্লির অদূরে কৌশলগত হিন্দন বিমানঘাঁটিতে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে।
নিরাপত্তাজনিত চরম কৌশল ও চরম গোপনীয়তা বজায় রাখার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উড্ডয়ন ও পুরো আকাশপথ অতিক্রমের সময় ওই সামরিক বিমানের ট্রান্সপন্ডার বা স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল যন্ত্রটি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সামরিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বেসামরিক বিমান চলাচলের প্রচলিত বা নির্ধারিত আন্তর্জাতিক রুট বা আকাশপথ ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ বিকল্প এবং গোপন রুট ব্যবহার করে বিমানটি ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশের প্রাক্কালে কলকাতার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে আকস্মিক যোগাযোগ স্থাপন করা হয় এবং জরুরি অবতরণের অনুমতি চাওয়া হয়।
সামরিক সূত্রের সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে অত্যন্ত নিরাপদে ভারতের ভূখণ্ডে পৌঁছে দেওয়ার পর ওই নির্দিষ্ট বিমানটি তার সঙ্গে থাকা অন্যান্য ক্রু ও নিরাপত্তারক্ষী সদস্যদের নিয়ে পরবর্তীতে ঢাকায় নিরাপদে ফিরে আসে। এই ঐতিহাসিক ও স্পর্শকাতর ফ্লাইটটি সফলভাবে সম্পন্ন করার পর পরবর্তীতে পাইলট এয়ার কমোডর শামীম রেজাকে দীর্ঘমেয়াদি একটি বিশেষ সামরিক কৌশলগত কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য ফিলিপাইনে পাঠানো হয়েছিল। কোর্স শেষে দেশে ফিরে তিনি বর্তমানে বিমানবাহিনীর বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। আর এই পুরো অভিযানের অন্যতম কারিগর ও কো-পাইলট উইং কমান্ডার মাহফুজ বর্তমানে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা পরিদপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সেই সন্ধিক্ষণে আকাশপথের এই গোপনীয় মিশন এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাইলটদের বর্তমান কর্মস্থল নিয়ে দেশবাসীর কৌতুহলের আজও কোনো কমতি দেখা যায় না।


