প্রকাশ:০৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই, ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন আত্মত্যাগ এবং হাজারো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত ফ্যাসিবাদমুক্ত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরির এক গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের ফলকে নস্যাৎ করতে একটি কুচক্রী মহল অহেতুক নানা ইস্যু তৈরি করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করার মাধ্যমে তারা নিজেদের অজান্তেই ইতিহাসের পাতা থেকে বিতাড়িত, পরাজিত ও পলাতক স্বৈরাচারী শক্তির পুনরুত্থানের পথকে সুগম করছে কি না, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বুধবার দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ঐতিহাসিক ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বার্তা দেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এই দিনটিকে আরেকটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা পৈশাচিক ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দেশের হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে গুম ও অপহরণের অভিশাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন। লাখ লাখ মানুষ দিনের পর দিন অমানবিক নির্যাতন, পুলিশি হামলা এবং গায়েবি ও মিথ্যা মামলার খড়্গে জর্জরিত হয়ে নিজের ঘরবাড়ি ও প্রিয়জনদের ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন ফ্যাসিবাদের বুলেট মাথায় নিয়ে শাহাদাতবরণ করেছিলেন হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু। এ ছাড়া নির্বিচারে চালানো গুলিতে চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ ও গুরুতর আহত হয়েছিলেন কমপক্ষে ত্রিশ হাজার মানুষ।
ফ্যাসিবাদবিরোধী সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে শহীদ হওয়া সকল বীর সেনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হতাহতদের প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমি জানাই আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে গভীর সহানুভূতি ও সমবেদনা। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের অপ্রতিরোধ্য গতিকে স্তব্ধ করতে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট চক্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নিরীহ ও গণতন্ত্রকামী সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছিল। পৃথিবীর সভ্য ও আধুনিক জগতে পতিত, পরাজিত ও বিতাড়িত এই ফ্যাসিস্টদের এমন নৃশংসতা এবং বর্বরোচিত আচরণ এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে, যা মানবতাকেও লজ্জিত করেছে।
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিরোধী মত দমন এবং জনগণের অধিকার হরণ করতে গুম, খুন ও অপহরণের সংস্কৃতিকে একেবারে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাষ্ট্রীয় এই পৈশাচিকতার একমাত্র তুলনা চলতে পারে কেবল স্বাধীনতা-উত্তর সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনের সঙ্গেই। এমন এক ধ্বংসস্তূপ ও ভীতিকর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে দাঁড়িয়ে আজকের এই ঐতিহাসিক ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তাদের বীর পূর্বসূরিদের সাহসী সংগ্রামের ইতিহাস সগৌরবে তুলে ধরবে। একই সঙ্গে এই জাদুঘরের দেওয়ালে উন্মোচিত হবে সেই বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের আসল ও কুৎসিত মুখোশ।
সরকারপ্রধান আরও বলেন, এই স্মৃতি জাদুঘর কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়, এটি আমাদের আপামর জনসাধারণের দীর্ঘ সংগ্রাম, বুকফাটা আর্তনাদ, আত্মত্যাগ, বেদনা, সাহস এবং পবিত্র গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে জাতীয় স্মৃতিতে চিরতরে ধারণ করার একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। আমি গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করি যে, এই জাদুঘর শুধুমাত্র ২০২৪ সালের সেই রক্তক্ষয়ী ও নৃশংস ঘটনার একটি সাধারণ স্মারক হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই জাদুঘর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নাড়ির সম্পর্কের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরবে। শুধু জুলাই অভ্যুত্থানই নয়, বরং এ দেশে সংঘটিত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসও এই জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকা অত্যন্ত জরুরি ও অপরিহার্য।
ইতিহাসের নানা অধ্যায় টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই দেশ থেকে বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্র কখনোই এ দেশের মাটিতে একটি সুস্থ ও সাবলীল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে স্বস্তিতে মেনে নিতে পারেনি। এদেরই আদর্শিক পূর্বসূরিরা ১৯৭৫ সালে সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তন করে এ দেশে চিরতরে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল। পরবর্তীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দেশের মাটি ও মানুষের কল্যাণে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্র সাফল্যের সঙ্গে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার এই ধারাবাহিক ও গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগুলো যদি ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তবে এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নানাভাবে উপকৃত হবে এবং সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এই জাদুঘরে জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের প্রতিটি শহীদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয়, তাদের জীবনকথা, আহতদের সরাসরি সাক্ষ্য, অভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী বীর ছাত্র-জনতার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, দুর্লভ আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন, প্রতিবাদের নানা পোস্টার, সুদৃশ্য দেওয়াল লিখন, তাৎপর্যপূর্ণ গ্রাফিতি, কার্টুন, কবিতা, গান, নাটক, শিল্প চিত্রকর্ম, ব্যক্তিগত স্মারক এবং আধুনিক সব ডিজিটাল উপাদান যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকবে। যারা এই জাদুঘরকে সমৃদ্ধ করার জন্য নিজেদের অতি মূল্যবান ব্যক্তিগত স্মারক, দলিল, আলোকচিত্র ও শিল্পকর্ম স্বেচ্ছায় প্রদান করেছেন, তাদের প্রত্যেককে সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াইয়ে যারা বিভিন্নভাবে হতাহত হয়েছেন, তাদের প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা হবে। তবে এই বিচার প্রক্রিয়ার নামে কোনো ধরনের প্রতিহিংসামূলক বা রাজনৈতিক হীনম্মুন্যতার আশ্রয় নেওয়া হবে না। দেশের প্রচলিত আইনের সঠিক ও যথাযথ প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনুসরণ করে সেই বিচার হবে অত্যন্ত স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং দেশবাসীর কাছে বিশ্বাসযোগ্য। বর্তমান সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, রাষ্ট্রে আইনের সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্যই প্রতিটি অপরাধের উপযুক্ত বিচার হওয়া অপরিহার্য।
দেশের আপামর গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ কখনোই আশা করে না যে এই ঐতিহাসিক জাদুঘর কোনো নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা কোনো বিশেষ ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য বা প্রোপাগান্ডা প্রতিষ্ঠার স্থান হয়ে উঠবে। কারণ, ২০২৪ সালের এই গৌরবোজ্জ্বল গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। এই মহান অভ্যুত্থানের প্রকৃত ও একমাত্র নায়ক হলো এ দেশের মুক্তিকামী গণতন্ত্রকামী সাধারণ জনগণ। আমি আমার ভাষণে প্রায়শই একটি সত্য উচ্চারণ করি, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমাদের চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই, আর ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই অর্জিত দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার লড়াই। এ দেশের সংগ্রামী জনগণ যেমন মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কখনো ভুলে যায়নি, ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় আত্মোৎসর্গকারী শহীদদেরও জনগণ কোনোদিনই ভুলবে না।


