প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় অবস্থিত ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতালকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সর্বশেষ জেলা প্রশাসনের অভিযানে হাসপাতালটি সিলগালা করার পর এর অতীত কার্যক্রম, চিকিৎসাসেবা, লাইসেন্স, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং রোগীদের অভিযোগগুলো আবারও সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা, অবহেলা, অতিরিক্ত বিল আদায়, প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা এবং রোগীদের সঙ্গে অসদাচরণের মতো নানা অভিযোগ উঠলেও কার্যকর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি পরিচালিত মোবাইল কোর্টের অভিযানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বৈধ লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে বলা হলেও তা না করায় সোমবার (২০ জুলাই) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিহাব বিন আমিনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে হাসপাতালটি সিলগালা করা হয়। এর আগের দিন, ১৯ জুলাই পরিচালিত অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে হাসপাতালটিকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স ও অন্যান্য সরকারি অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযানের সময় ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব নথি উপস্থাপন করতে পারেনি। এ কারণে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে অভিযোগের ইতিহাস আরও দীর্ঘ। স্থানীয় সূত্র এবং পূর্ববর্তী বিভিন্ন ঘটনার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের শেষ দিকে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকেই হাসপাতালটি বিভিন্ন সময়ে সমালোচনার মুখে পড়ে। রোগীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়া চিকিৎসাসেবা প্রদান, অপ্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা এবং রোগীর অবস্থার অবনতি হলেও যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার মতো অভিযোগ একাধিকবার উঠেছে।
বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের এপ্রিলে একই দিনে পৃথক দুটি প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। নিহতরা ছিলেন সিলেট সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ইউনিয়নের কল্লগ্রামের বাসিন্দা আসমা বেগম এবং জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নের চুনাহাটি গ্রামের ফয়জুন্নাহার চৈতি।
ফয়জুন্নাহার চৈতির স্বামী রুবেল আহমদের অভিযোগ ছিল, তাঁর স্ত্রীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর প্রথমে অবস্থার উন্নতি থাকলেও পরে একটি ইনজেকশন প্রয়োগের পর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, রোগীর আগেই মৃত্যু হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়নি এবং মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
একই ঘটনায় নিহত আসমা বেগমের ভাই কাইয়ুম আল রনি অভিযোগ করেছিলেন, প্রসববেদনা শুরু হওয়ার আগেই অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও সিনিয়র চিকিৎসকদের পাওয়া যায়নি। তাঁর দাবি, একটি ইনজেকশন প্রয়োগের পরই রোগীর মৃত্যু ঘটে এবং চিকিৎসায় অবহেলাই মৃত্যুর কারণ।
পরবর্তী সময়েও হাসপাতালটির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ সামনে আসে। ২০২০ সালে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার নাগরী পুঁথি পাঠক আলী আহসাবের চিকিৎসা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ ছিল, চিকিৎসাসেবা যথাযথভাবে না দিয়ে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। এমনকি রোগীকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়ার আগে চিকিৎসা বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সে সময় পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালের আগস্টে আবারও হাসপাতালটি আলোচনায় আসে গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মাওলানা শফিকুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মূত্রথলির পাথরের অস্ত্রোপচারের পর বিশ্রামকক্ষে থাকা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। স্বজনদের দাবি, মৃত্যুর পর দায়িত্বরত চিকিৎসক হাসপাতাল ত্যাগ করেন এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে কেউ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেননি। তবে চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ হয়নি।
লাইসেন্স সংক্রান্ত জটিলতার কারণেও একাধিকবার প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েছে ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল। ২০২৫ সালের জুলাই মাসেও হাসপাতালটির লাইসেন্স নবায়ন না থাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে সিলগালা করেছিল। পরে দ্রুত লাইসেন্স নবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ অভিযানে আবারও একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ায় প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়।
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. তানভীর হোসেন সজিব জানিয়েছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আগেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ করার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও তারা বৈধ নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি। ফলে আইন অনুযায়ী হাসপাতালটি সিলগালা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য শুধু লাইসেন্স থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং নিয়মিত সরকারি তদারকি। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যদি বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, তবে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের বিষয়ে ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তারা কোনো ব্যাখ্যা বা বক্তব্য দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
সর্বশেষ প্রশাসনিক অভিযানের পর হাসপাতালটি বন্ধ থাকলেও অতীতের অভিযোগ, রোগীদের অভিজ্ঞতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যখাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি এবং আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা।


