প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবি বিকৃত করা, ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর পোস্ট ছড়িয়ে সম্মানহানির অভিযোগ এনে সিলেটের জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা রাফিয়া আক্তার বৃষ্টি সাইবার ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা মামলায় তিনি দাবি করেছেন, একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত সুনাম নষ্ট করতে দীর্ঘদিন ধরে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সিলেট সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলার আবেদন করার পর আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাফিয়া আক্তার বৃষ্টি। তিনি অভিযোগ করেন, মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে তাঁর ছবি বিকৃত করে একের পর এক ভুয়া ফটোকার্ড ও মানহানিকর পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসবের কিছুতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমনভাবে ছবি সম্পাদনা করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারেন।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে রাফিয়া বলেন, তিনি শুধু একজন কনটেন্ট নির্মাতা নন, একজন মা-ও। তাঁর ভাষায়, “আমি শুধু নারী নই, আমি একজন মা। আমার সন্তান বড় হয়ে যদি এসব বিকৃত ছবি দেখে, তাহলে সে কী ভাববে? আমার বাবা একজন হৃদরোগী। তিনি তো বুঝবেন না কোনটি আসল আর কোনটি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এসব দেখে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন।”
সিলেটি ভাষায় নির্মিত কনটেন্টের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া রাফিয়া আক্তার বৃষ্টি সম্প্রতি বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে নতুন কোনো কনটেন্টের কারণে নয়, বরং তাঁর বিরুদ্ধে ছড়ানো অপপ্রচার ও ডিজিটাল হয়রানির অভিযোগে এবার তিনি আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
আদালতে জমা দেওয়া মামলার এজাহারে রাফিয়া উল্লেখ করেন, পরিকল্পিতভাবে তাঁর ছবি বিকৃত করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করা হয়েছে এবং বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে মানহানিকর পোস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পোস্টের মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক অবস্থান এবং পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৬ জুন থেকে ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তাঁর ছবি ব্যবহার করে একাধিক পোস্ট প্রকাশ করা হয়। এসব পোস্টে দাবি করা হয়, তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত, ‘হানিট্র্যাপ’ পরিচালনা করেন, অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং অল্প সময়ে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাফিয়ার দাবি, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শুধু মানহানিকর পোস্ট প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি একটি চক্র। তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বারবার রিপোর্ট করে কনটেন্টের স্বাভাবিক প্রচার ব্যাহত করারও চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে তাঁর পেশাগত কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
আদালতে জমা দেওয়া পিটিশনে আরও বলা হয়েছে, একটি ফেসবুক গ্রুপে বিদেশে অবস্থানরত এক ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ তুলে তাঁর ছবি ব্যবহার করে পোস্ট করা হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি প্রকাশ করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রাফিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ধারাবাহিক এই অপপ্রচার শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর পুরো পরিবারকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তিনি দাবি করেন, সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির পাশাপাশি আর্থিক ও পেশাগত ক্ষতিরও মুখোমুখি হয়েছেন। একজন নারী হিসেবে এমন অপপ্রচার তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা ও নিরাপত্তাবোধেও আঘাত হেনেছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. জাবের হুসাইন জানান, সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২২, ২৫ এবং ২৭ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলার নম্বর ১২৯/২০২৬। তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন নারীর ছবি বিকৃত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। শুধু ব্যক্তিগত মানহানি নয়, এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নও। তিনি আদালতের কাছে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধকে জামিন-অযোগ্য হিসেবে বিবেচনার দাবি জানান।
আইনজীবী আরও বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কারও চরিত্রহনন বা সামাজিক অবস্থান নষ্ট করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এসব ঘটনায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক মানুষ একই ধরনের ডিজিটাল অপরাধের শিকার হতে পারেন।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার আগে রাফিয়া সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করতে গিয়েছিলেন। তবে অভিযোগ গ্রহণ না করে তাঁকে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে তিনি সিলেট সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলার আবেদন করেন।
সিলেট সাইবার ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি আমলে নিয়ে আদালত মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন যেমন সৃজনশীল ও ইতিবাচক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, তেমনি কিছু অসাধু ব্যক্তি এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছেন ভুয়া ছবি, ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরির জন্য। বিশেষ করে পরিচিত ব্যক্তি, সাংবাদিক, কনটেন্ট নির্মাতা এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্য করে এ ধরনের ডিজিটাল অপপ্রচার বাড়ছে। এতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সমাজে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও ছবি বিকৃত করা, মিথ্যা তথ্য প্রচার করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া শুধু নৈতিকভাবে নিন্দনীয় নয়, এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধও। তাই এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাফিয়া আক্তার বৃষ্টির করা এই মামলা দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার এবং অনলাইন মানহানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা যায় কি না, সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহল এবং সাধারণ মানুষের।


