প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
টানা দুই দিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জজুড়ে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও মঙ্গলবার থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি উজানের ঢলও হ্রাস পাওয়ায় জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি নামতে শুরু করেছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে জেলার নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের মাঝে। যদিও প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজরদারি অব্যাহত রেখেছে, কারণ বর্ষা মৌসুমে আবহাওয়ার পরিবর্তন দ্রুত নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি ষোলঘর পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী যাদুকাটা, রক্তি ও বাউলাই নদীর পানিও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। এতে নতুন করে বড় ধরনের প্লাবনের আশঙ্কা আপাতত অনেকটাই কমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ছাতক পয়েন্টেও সুরমা নদীর পানি কমার প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ১০ সেন্টিমিটার হ্রাস পেলেও এখনও বিপৎসীমার ছয় সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে ছাতক ও আশপাশের নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পানি কমতে শুরু করলেও উজানে আবার ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জ অঞ্চলে মাত্র পাঁচ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কয়েকদিন আগের তুলনায় এই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক কম। পাশাপাশি ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের প্রবাহও আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় নদীগুলোর পানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত না হলে আগামী কয়েকদিন পানি আরও কমতে পারে।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল বরাবরই বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকিতে থাকে। প্রতিবছর উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং কৃষি, যোগাযোগ ও জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এ কারণে সামান্য পানি বৃদ্ধির খবরেও স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।
জেলার বাসিন্দা রবিউল হাসান বলেন, বর্ষা এলেই বৃষ্টি আর নদীর পানি বাড়ার খবর শুনে মানুষ আতঙ্কে থাকে। অতীতের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা এখনও অনেকের মনে দাগ কেটে আছে। তাই নদীর পানি কমতে শুরু করায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে আবহাওয়ার পরিস্থিতি নিয়ে এখনও মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে নদীর পানি বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় খাদ্য, শুকনো খাবার ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে শুরু করেছিল। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের মানুষ সম্ভাব্য বন্যার কথা মাথায় রেখে গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে পানি কমতে শুরু করায় তারা কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছেন।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক জানিয়েছেন, বর্তমানে জেলার নদ-নদীর পানি কমার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত জেলার কোনো এলাকা প্লাবিত হয়নি, যা অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড সার্বক্ষণিকভাবে নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরিস্থিতির যেকোনো পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্ষা মৌসুমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে পাহাড়ি ঢলের প্রভাব দ্রুত দেখা দেয়। ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলে অতিবৃষ্টি হলে তার প্রভাব কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুনামগঞ্জের নদ-নদীতে পড়ে। ফলে স্থানীয়ভাবে বৃষ্টিপাত কম হলেও উজানের ঢলে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। এ কারণে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অল্প সময়ের মধ্যে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল এবং দ্রুত নদীর পানি বৃদ্ধি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠছে। ফলে বন্যা ব্যবস্থাপনায় আগাম পূর্বাভাস, কার্যকর মনিটরিং এবং স্থানীয় জনগণকে দ্রুত সতর্ক করার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এদিকে জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। নদীর পানি পুনরায় বৃদ্ধি পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী ও হাওরাঞ্চলের মানুষকে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ এবং গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, পানি কমতে শুরু করায় কৃষক, জেলে, নৌযান চালক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। কারণ বড় ধরনের বন্যা দেখা দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি, মৎস্যসম্পদ, গ্রামীণ সড়ক এবং শিক্ষা কার্যক্রম। তাই আপাতত প্লাবনের আশঙ্কা না থাকায় মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক হলেও বর্ষা মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ, নদীর পানি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা বজায় রাখলেই সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা ও প্রশাসনের সমন্বিত প্রস্তুতিই যেকোনো আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।


