প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল জাদুকাটা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় করা বহুল আলোচিত মামলায় নতুন অগ্রগতি এসেছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পরিবেশ অধিদপ্তর আদালতে ২৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। একই সঙ্গে তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় মামলার এজাহারভুক্ত ১০ জনের নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বাদ পড়াদের মধ্যে উপজেলা বিএনপির এক নেতাও রয়েছেন। এ ঘটনায় আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের।
পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের পরিদর্শক এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সোমবার (৬ জুলাই) সুনামগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (তাহিরপুর জোন)-এ অভিযোগপত্র জমা দেন। দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে এই অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ অক্টোবর পরিবেশ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক বাদী হয়ে তাহিরপুর থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি আরও ২০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড় এলাকায় জাদুকাটা নদীর তীর কেটে সংঘবদ্ধভাবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে, যা শুধু সরকারি সম্পদের ক্ষতিই করেনি, বরং নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ৬ অক্টোবর থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত কয়েক দিন ধরে শত শত নৌকা ও বাল্কহেড ব্যবহার করে নদী থেকে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হয়। নদীর তীর কেটে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট করে এই বালু লুটের ঘটনা সংঘটিত হয়। স্থানীয়ভাবে এ ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে।
দাখিল করা অভিযোগপত্রে তাহিরপুর উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বাদাঘাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আফতাব উদ্দিন, বাদাঘাট ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি খাজা মাইনুদ্দিন, মোশাহিদ আলম ওরফে রানু মেম্বার, জামাল মিয়া, বিল্লাল মিয়া, বোরহান উদ্দিনসহ মোট ২৭ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই ঘটনায় এর আগে মোশাহিদ আলম ওরফে রানু মেম্বারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। নতুন অভিযোগপত্রে তার নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় মামলার বিচার কার্যক্রম আরও এগিয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অন্যদিকে মামলার এজাহারে নাম থাকা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রাকাব উদ্দিনসহ মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে তদন্তে অভিযোগের সমর্থনে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দিয়েছেন। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়েছে, কেবল তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নয়, বরং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মামলার বাদী ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাইমিনুল হক বলেন, তদন্ত একটি দীর্ঘ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া। এতে যাদের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের নামই অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় আইন অনুযায়ী তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
জাদুকাটা নদী বাংলাদেশের অন্যতম নান্দনিক ও পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর একটি। ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির এই নদী সারা বছরই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হাজারো পর্যটক তাহিরপুরে ভিড় জমান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তীরবর্তী এলাকা এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে পরিবেশবিদরা সতর্ক করে আসছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তীরভাঙনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে পর্যটন সম্ভাবনাও হুমকির মুখে পড়ে। তাই জাদুকাটার মতো সংবেদনশীল নদী রক্ষায় কঠোর নজরদারি ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি বলে তারা মনে করেন।
এদিকে জাদুকাটা নদীর বালুমহাল নিয়ে সরকারের রাজস্ব আহরণেও প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছর নদীর দুটি বালুমহাল ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। তবে চলতি বছরে আদালতের নির্দেশে ইজারা কার্যক্রম স্থগিত থাকায় কোনো বালুমহাল ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, একদিকে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বৈধ ইজারা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সরকারও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। তারা মনে করছেন, পরিবেশ রক্ষা এবং সরকারি রাজস্ব নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও আইনসম্মত ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।
আইনজীবীরা বলছেন, আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণের পর মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে। বিচার চলাকালে সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের ভিত্তিতে আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন। অভিযোগপত্র দাখিল হওয়া মানেই অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়; বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আদালতের রায়ের মাধ্যমেই তাদের দায় বা নির্দোষিতা নির্ধারিত হবে।
পরিবেশ সচেতন মহলের প্রত্যাশা, জাদুকাটা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এই মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড আর না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নদী এবং এর প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।


