প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের সিলেট সফর ঘিরে নগরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সফরকালে তিনি সিলেটের শতবর্ষের ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি এবং আতিথেয়তায় মুগ্ধতার কথা প্রকাশ করেন। বিশেষ করে ঐতিহাসিক কিনব্রিজ, আলী আমজদের ঘড়িঘর, সুরমা নদীর মনোমুগ্ধকর পরিবেশ এবং বিশ্বের কাছে পরিচিত সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাত রঙের চা তার সফরকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে সিলেট সফর করে। সফরের অংশ হিসেবে প্রতিনিধিদল সিলেট সিটি কর্পোরেশন পরিদর্শন করে এবং নগরের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনে পৌঁছালে রাষ্ট্রদূত ও তার সফরসঙ্গীদের স্বাগত জানান সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে এক সৌজন্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিলেট নগরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, নগর উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটনের সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। এটি ছিল সম্পূর্ণ সৌজন্যমূলক বৈঠক, যেখানে দুই দেশের পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার বিষয়েও মতবিনিময় হয়।
বৈঠক শেষে রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত সিলেটের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন কিনব্রিজ পরিদর্শন করেন। প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নগরজীবনের প্রতীক হয়ে থাকা এই সেতুর স্থাপত্যশৈলী এবং সংরক্ষিত অবস্থা রাষ্ট্রদূতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার সংরক্ষণ ও সংস্কার কার্যক্রমের প্রশংসা করেন।
এরপর প্রতিনিধিদল আলী আমজদের ঐতিহাসিক ঘড়িঘর পরিদর্শন করে। সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত এই স্থাপনাটি সিলেটের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে। ঘড়িঘরের ঘণ্টাধ্বনি উপভোগ করার পাশাপাশি রাষ্ট্রদূত এবং তার সফরসঙ্গীরা সেখানে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সৌন্দর্য ও পরিবেশ তাদের মুগ্ধ করে বলে উপস্থিত সংশ্লিষ্টরা জানান।
সফরকালে প্রতিনিধিদল সুরমা নদীর তীরের সৌন্দর্যও উপভোগ করেন। বর্ষার মৌসুমে নদীর প্রাকৃতিক রূপ, নদীতীরের পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নগরের সৌন্দর্যায়ন কার্যক্রম তাদের দৃষ্টি কাড়ে। নগরের পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকারও প্রশংসা করেন রাষ্ট্রদূত।
অতিথিদের সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন ব্যান্ড মনোমুগ্ধকর সঙ্গীত পরিবেশন করে। বিশেষ আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের কিংবদন্তি ব্যান্ডশিল্পী প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘সেই তুমি’ পরিবেশনা। বিদেশি শিল্পীদের কণ্ঠে বাংলা এই জনপ্রিয় গান শুনে উপস্থিত অতিথি ও দর্শনার্থীরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অনুষ্ঠানস্থলে সৃষ্টি হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক আবহ, যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধনের এক সুন্দর প্রতীক হয়ে ওঠে।
সফরের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল সিলেটের বিখ্যাত সাত রঙের চা। অতিথিদের আপ্যায়নের অংশ হিসেবে পরিবেশন করা হয় এই ঐতিহ্যবাহী পানীয়। বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্ন রঙ ও স্বাদের সমন্বয়ে তৈরি এই চা বহু বছর ধরে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে সিলেটের অন্যতম পরিচিত আকর্ষণ। রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনও আগ্রহভরে সাত রঙের চায়ের স্বাদ গ্রহণ করেন এবং এর ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের প্রশংসা করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সফর শেষে সাংবাদিকদের জানান, এটি ছিল সম্পূর্ণ সৌজন্যমূলক সফর। বৈঠকে কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা, উন্নয়ন প্রকল্প বা প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়নি। তবে মার্কিন প্রতিনিধিদল সিলেটের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি, পর্যটন সম্ভাবনা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বেশি তুলে ধরার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা যখন সিলেট সফর করেন এবং এখানকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রশংসা করেন, তখন তা শুধু এই অঞ্চলের জন্য নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্যই ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিলেটের পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে পর্যটন বিকাশেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা-বাগান, নদী, পাহাড়, হাওর এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সম্প্রতি নগরের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণ, সৌন্দর্যায়ন এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়ায় বিদেশি দর্শনার্থীদের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কূটনৈতিক সফর কেবল সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি একটি অঞ্চলের ইতিবাচক ভাবমূর্তি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সুযোগও তৈরি করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে পর্যটন, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের এই সফরও তেমনই একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আন্তরিক আতিথেয়তার সমন্বয়ে সিলেট যে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সেই পরিচয়ই বিদেশি প্রতিনিধিদলের সামনে আরও একবার তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে এই সফর। স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও এ ধরনের আন্তর্জাতিক সফর সিলেটকে বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও পরিচিত করে তুলবে এবং নগরের পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।


