প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় ঘর ছেড়ে যাওয়া সিলেটের তরুণদের অনেকেই পরিবারের স্বপ্ন পূরণে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বদলে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবারের ভাগ্য, সচল থাকছে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি চাকা। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই যখন দুর্ঘটনা কিংবা কর্মস্থলের ঝুঁকিতে একের পর এক প্রাণ ঝরে পড়ে, তখন একটি পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকের অন্ধকারে। সম্প্রতি কাতার, সৌদি আরব ও পর্তুগালে পৃথক দুর্ঘটনায় সিলেটের অন্তত নয়জন প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যু এমনই এক বেদনাদায়ক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। স্বজন হারানোর শোকে কাঁদছে একের পর এক পরিবার, আর বিদেশে থাকা প্রিয়জনদের নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন হাজারো অভিভাবক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো নয়জনের মধ্যে পাঁচজন কাতারে, তিনজন সৌদি আরবে এবং একজন পর্তুগালে মারা গেছেন। কাতারে নিহত পাঁচজনের মরদেহ ইতোমধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশে আনা হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও পর্তুগালে নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে কাতারে। গত ২১ জুন দেশটির শাহানিয়া এলাকায় ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা। তারা হলেন ঝিংগাবাড়ী ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের জিবাল উদ্দিন, মাঝতালুক গ্রামের জসিম উদ্দিন, আগতালুক গ্রামের মস্তাক আহমদ, একই গ্রামের জুবায়ের আহমদ এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ী গ্রামের কাদের আহমদ। দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে গত ৩০ জুন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। নিজ গ্রামে স্বজনদের শেষ বিদায়ের দৃশ্য পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে তারা কাতারে গিয়েছিলেন। অনেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাদের পাঠানো অর্থেই চলত সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সেই পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপের দেশ পর্তুগালেও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার যুবক মো. শামসুল ইসলাম কামরান। গত ৪ জুলাই স্থানীয় সময় রাতের দিকে পর্তুগালের সেতুবালের আলমেদা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাকে দ্রুত স্থানীয় আলমেদা হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ জুলাই বিকেলে তার মৃত্যু হয়। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই তার জীবনাবসান ঘটে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, জীবিকার তাগিদে বিদেশে গিয়ে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কামরান। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নিল না।
এদিকে সৌদি আরবেও পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সিলেটের তিন প্রবাসী। রাজধানী রিয়াদের অলাইয়া এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময় লিফট শ্যাফটে পড়ে মারা যান কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জয় আহমদ ও মোহাম্মদ মোতাহার হোসাইন। গত ৪ জুলাই বিকেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র জানায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় ভবনের লিফট শ্যাফটে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।
এ ছাড়া সৌদি আরবের জেদ্দায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন কানাইঘাট উপজেলার মুক্তাপুর গ্রামের তারেক আহমদ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মস্থলের দায়িত্ব শেষ করে গাড়ি চালানো শেখার সময় তিনি দুর্ঘটনার শিকার হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ জুলাই তার মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, বিদেশে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছিলেন তিনি।
বিদেশে কর্মরত প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, প্রতিদিনই তারা উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটান। প্রিয়জনের ফোন না পেলে বা কোনো দুর্ঘটনার খবর শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে। সিলেটের হেতিমগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা জহিরুল ইসলামের মা সুফিয়া খানম বলেন, তার ছেলে আট বছর ধরে সৌদি আরবে গাড়ি চালানোর কাজ করছেন। পরিবারের সব ব্যয়, দুই মেয়ের লেখাপড়া এবং তার নিজের চিকিৎসার খরচ ছেলের পাঠানো অর্থেই চলে। প্রতিদিন ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগে থাকতে হয়। বিদেশের মাটিতে কোনো দুর্ঘটনার খবর শুনলেই মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। তিনি বলেন, দূরে থাকা সন্তানের জন্য দোয়া করা ছাড়া একজন মায়ের আর কিছুই করার থাকে না।
প্রবাসী কল্যাণ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তবে দুর্ঘটনার পর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসগুলো নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার কারণে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে কিছুটা সময় লাগে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে নির্মাণ, পরিবহন ও ভারী শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে কিংবা অসাবধানতার কারণে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধি সম্পর্কে সচেতনতা এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। প্রতি বছর তারা বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু এই অবদানের পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ত্যাগ, কষ্ট এবং ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন। সাম্প্রতিক এই নয়টি মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রতিটি রেমিট্যান্সের পেছনে রয়েছে একজন মানুষের ঘাম, শ্রম এবং অনেক সময় জীবনের সর্বোচ্চ মূল্য।
সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় এখন শোকের ছায়া। যেসব ঘরে একসময় বিদেশফেরত সন্তানের অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন বাবা-মা, স্ত্রী কিংবা সন্তানরা, সেই ঘরেই ফিরেছে প্রিয়জনের নিথর মরদেহ অথবা মৃত্যুসংবাদ। এই বেদনা শুধু কয়েকটি পরিবারের নয়, বরং পুরো প্রবাসী সমাজের। তাই প্রবাসীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।


