প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা জৈন্তাপুরে চোরাচালান বিরোধী এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে স্থানীয় পুলিশ। বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার ৫ নম্বর ফতেপুর ইউনিয়নের বালিপাড়া গ্রামে পরিচালিত এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়েছে। অবৈধ পথে আসা ৭৫ বস্তা জিরা উদ্ধার করেছে পুলিশ, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই অভিযান সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাকারবারী চক্রের অশুভ তৎপরতাকে আবারও জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।
অভিযান পরিচালনার সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে বাড়ীর মালিক জমির উদ্দিনসহ চোরাকারবারী দলের সদস্যরা দ্রুত সটকে পড়ে। ফলে কাউকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব না হলেও, চোরাচালানের বিশাল এই চালানটি জব্দ করতে সক্ষম হয় পুলিশ। অভিযানের পর থেকেই এলাকাটি ঘিরে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে জৈন্তাপুর মডেল থানা পুলিশ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই এই এলাকায় চোরাচালানের গোপন গুদাম হিসেবে কিছু বাড়িকে ব্যবহার করা হচ্ছিল। পুলিশের এই সফল অভিযান চোরাচালান প্রতিরোধে প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী চারিকাটা ইউনিয়নের বিভিন্ন দুর্গম সীমান্ত পথ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পণ্য প্রবেশ করিয়ে আসছে একটি শক্তিশালী চোরাকারবারী চক্র। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত শাহজানের নেতৃত্বে নিয়মিতভাবে ভারতীয় জিরা, চিনি এবং অন্যান্য সামগ্রী সীমান্ত পার হয়ে হরিরিপুর এলাকার বিভিন্ন গোপন গুদামে মজুদ করা হতো। এরপর সুবিধামতো সময়ে এসব পণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন জেলায় পাচার করা হতো। চক্রটি এতটাই সুসংগঠিত যে, তারা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের মজুত করা পণ্য সরিয়ে ফেলতে অভ্যস্ত ছিল, যার ফলে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই গুদাম ফাঁকা হয়ে যেত।
জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানান, চোরাকারবারীরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। সীমান্ত থেকে পণ্য সংগ্রহ করে তা অস্থায়ী গোডাউনে মজুত করা এবং সুযোগ বুঝে দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নেওয়াই ছিল তাদের মূল কৌশল। তবে পুলিশও এবার চোরাচালান রোধকল্পে তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। এখন সরাসরি চোরাচালানের রুটগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি চোরাকারবারীদের ব্যবহৃত সম্ভাব্য গোডাউনগুলোকে শনাক্ত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি গুদাম চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে বালিপাড়া গ্রামের এই গোদামটি অন্যতম।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন যে, যেসব গোদামে পণ্য মজুত থাকার গোপন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি রাখা হচ্ছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই গুদাম খালি হয়ে যাচ্ছে, তবু অভিযান অব্যাহত থাকবে। সীমান্তবর্তী এই এলাকায় চোরাচালান কেবল দেশের রাজস্ব ক্ষতিই করে না, বরং এটি স্থানীয় পর্যায়ে অসামাজিক কার্যকলাপ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটায়। চোরাকারবারীরা প্রায়ই প্রান্তিক ও বেকার যুবকদের অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, যা তরুণ প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, সীমান্ত এলাকাগুলোতে রাতের আঁধারে চোরাচালানের এই রমরমা কারবার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। অবৈধ পথে আসা পণ্যের কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরির চেষ্টাও চালানো হচ্ছে। অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, চোরাকারবারী চক্রটি এতটাই প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে যে, ভয়ে অনেকে মুখ খুলতে চান না। তবে প্রশাসনের আজকের এই অভিযানে তারা কিছুটা হলেও আশান্বিত হয়েছেন। তারা মনে করেন, যদি সীমান্ত পথে চোরাচালান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়, তবেই এই এলাকায় শান্তি ফিরে আসবে।
জৈন্তাপুরসহ সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে ভারতীয় পণ্যের অবৈধ অনুপ্রবেশ দীর্ঘদিন ধরে এক জটিল সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। জিরার মতো উচ্চমূল্যের মসলা জাতীয় পণ্যের চোরাচালান সরকারকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে। পুলিশ প্রশাসনের এই বিশেষ অভিযান সেই অসাধু ব্যবসায়ীদের মনে কিছুটা হলেও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তবে কেবল পণ্য জব্দ করাই সমাধান নয়, বরং এই চোরাচালান চক্রের নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শুধু আজকের এই অভিযানই শেষ নয়, বরং চোরাচালান নির্মূলে এমন অভিযান ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পলাতক বাড়ীর মালিক এবং মূল হোতা শাহজানসহ অন্যান্যদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। অবৈধ পণ্য পরিবহন ও মজুতের সাথে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন স্থানীয় প্রশাসন। সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে সিলেটের সামগ্রিক নিরাপত্তার স্বার্থে চোরাচালান বিরোধী এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। জব্দকৃত জিরার বস্তাগুলো বর্তমানে থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মাধ্যমে সেগুলো সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। এই ঘটনার পর পুরো জৈন্তাপুর উপজেলায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে যাতে করে চোরাকারবারী চক্র আর কোনো গুদামে পণ্য মজুত করার সাহস না পায়। একটি সুন্দর ও অপরাধমুক্ত জনপদ গড়ে তোলাই প্রশাসনের লক্ষ্য, আর সেই লক্ষ্য অর্জনে সাধারণ মানুষের সচেতন সহযোগিতা একান্ত কাম্য।


