প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিদেশ গমনের স্বপ্ন এখন আর কেবল ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং অধিকাংশ তরুণ-যুবকের কাছে তা এক মরিচিকার নাম। উন্নত জীবনের আশায় নিজের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে পাড়ি জমাতে চায় অনেকেই। আর এই সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই একটি চক্র সিলেটের সাত শতাধিক তরুণ-যুবকের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। মাত্র এক হাজার টাকায় কানাডার ভিসা পাওয়ার প্রলোভন এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সহজ শর্তে পাঠানোর মোড়কে এমেক্স অ্যাসোসিয়েটস নামে একটি প্রতিষ্ঠান যে প্রতারণার জাল বিস্তার করেছিল, তা এখন জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ইমন উদ্দিনের প্রতারণার কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন সাধারণ পরিবারের সাত শতাধিক যুবক। গত কয়েক বছরে আট থেকে দশ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত এই প্রতারক চক্রের মূল হোতা বর্তমানে আইনের মুখোমুখি হয়েছে।
প্রতারণার এই নীলনকশা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সাজানো হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অত্যন্ত চটকদার ও লোভনীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এমেক্স অ্যাসোসিয়েটস গ্রাহকদের আকৃষ্ট করত। ফেসবুকে সাজানো ও ভুয়া ভিসা প্রাপ্তির ভিডিওচিত্র প্রচার করে তারা তরুণদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, বিদেশে কর্মসংস্থান এখন হাতের মুঠোয়। কানাডায় মাত্র এক হাজার টাকায় ভিসা পাওয়ার অদ্ভুত প্রস্তাবটি বিশ্বাস করা কঠিন হলেও, বেকারত্বের তাড়নায় অনেক যুবকই সেই ফাঁদে পা বাড়িয়েছিলেন। এই প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছে চক্রটি। একেকজনের কাছে এক এক রকম অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নিয়ে এক জঘন্য জুয়া খেলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে সিলেট নগরের উপশহর এলাকায় কার্যক্রম চালালেও, গত ১৯ মে যখন হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠানটিতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, তখন ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারেন তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ইমন উদ্দিন ও তার সহযোগীরা তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পেজগুলো বন্ধ করে দিয়ে গা ঢাকা দেন। যারা তাদের স্বপ্ন পূরণ করার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তারাই আজ উধাও। ভুক্তভোগীদের দীর্ঘশ্বাস আর পরিবারের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে সিলেটের পরিবেশ। অনেকে জমি বিক্রি করে, অনেকে আবার ঋণ নিয়ে এই টাকা পরিশোধ করেছিলেন, এখন সেই ঋণের বোঝা তাদের জীবনে এক অভিশপ্ত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারেন তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের দ্বারস্থ হন তারা। এসএমপির শাহপরান থানায় ইমন উদ্দিন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একের পর এক চারটি মামলা দায়ের করা হয়। সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট সফরে এলে ভুক্তভোগীরা তার কাছে নালিশ জানান। মন্ত্রীর কঠোর নির্দেশে এবং পুলিশ কমিশনারের তৎপরতায় এই প্রতারক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়। আইনের দীর্ঘসূত্রতাকে পাশ কাটিয়ে, আদালতের বারান্দায় যখন ইমন উদ্দিন জামিন নিতে এসেছিলেন, তখন ভুক্তভোগীদের ক্ষুব্ধ জনতা তাকে ঘিরে ফেলে এবং পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এই আটক নাটকটি কেবল একজন প্রতারকের পতন নয়, বরং ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক উত্তেজনাকর পরিসমাপ্তি ছিল।
প্রতারক ইমন উদ্দিনের এই জঘন্য কর্মকাণ্ডের সাথে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগও ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। নিজেকে ছাত্রদল নেতা পরিচয় দিয়ে এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম ভাঙিয়ে সে ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি দেখাত। এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে যে, গ্রাহকদের হুমকি প্রদানের সময় সে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রার্থী আফজল হোসেনের নাম ব্যবহার করত। শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছবি ব্যবহার করে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করত সে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার তৈরি করা কিংবা কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের সাথে নিজের ছবি ভাইরাল করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা ছিল তার প্রতারণার অংশ। এসব ছবি সাধারণ মানুষকে তার প্রতি বিশ্বাস রাখতে বাধ্য করত, যার মাশুল আজ তাদের দিতে হচ্ছে।
শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফেরদৌস আহমদ জানিয়েছেন, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চারটি মামলা চলমান রয়েছে। একটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য তিনটিতে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বুধবার তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলেও ভুক্তভোগীদের মূল চাওয়া কেবল গ্রেপ্তার নয়, বরং তাদের হারানো টাকা ফিরে পাওয়া। আট থেকে দশ কোটি টাকার এই বিশাল অংকের অর্থ বর্তমানে কোথায় এবং কীভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে, তা তদন্ত করে বের করা পুলিশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। একই সাথে, কোনো প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন ছাড়া একজন ব্যক্তির পক্ষে এভাবে এত বড় প্রতারণা সম্ভব কি না, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতারণার পর ছাত্রদল নেতা আফজালের সাথে ইমনের বিমান ভ্রমণের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে যারা সমাজের সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকায় ভাগ বসায়, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। এই ঘটনা কেবল একটি আইনি মামলার বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ। হাজারো যুবকের স্বপ্নভঙ্গ করার এই প্রক্রিয়াটি আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রতারক ইমন উদ্দিন এখন আইনের জালে আবদ্ধ, কিন্তু সাত শতাধিক তরুণের যে স্বপ্ন ও অর্থ নষ্ট হয়েছে, তা কি কখনো ফিরে আসবে? তরুণ সমাজের মধ্যে বিদেশ গমনের যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তাকে পুঁজি করে যেন ভবিষ্যতে আর কোনো প্রতারক চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য প্রশাসন ও সচেতন নাগরিকদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা এবং প্রশাসনিক কঠোর নজরদারি। সিলেটের এই ঘটনা যেন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যেকোনো প্রলোভনের পেছনে না ছুটে বৈধ ও স্বীকৃত পন্থায় কর্মসংস্থানের খোঁজ করাই শ্রেয়। প্রতারকদের বিচার হোক, ভুক্তভোগীরা সুবিচার পাক—এমনটাই এখন সিলেটের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা।


