প্রকাশ: ৪ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।।
বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ইতিহাসে সাধারণত দেখা যায় যে, কোনো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হু হু করে বাড়ে প্রকল্পের ব্যয়। অতিরিক্ত ব্যয় এবং দীর্ঘসূত্রতা যেন আমাদের দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে এই চিরাচরিত ধারার বাইরে এসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চলেছে সিলেট-চারখাই-শেওলা স্থলবন্দর চার লেন মহাসড়ক প্রকল্পটি। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে যখন এই প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরুর পথে, তখন দেখা যাচ্ছে প্রকল্পের ব্যয় কমার এক অভাবনীয় তথ্য। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শুরু করতে না পারায় মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও, মূল অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের তুলনায় ব্যয় প্রায় ছয়শ কোটি টাকা কমিয়ে নতুন করে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা কমিটি। এই সংবাদটি কেবল সিলেটবাসীর জন্য নয়, বরং পুরো দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বয়ে এনেছে।
সিলেট-চারখাই-শেওলা স্থলবন্দরের ৪২ দশমিক ৯৮৫ কিলোমিটারের এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটিকে চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক কর্তৃক ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল অনুমোদন লাভ করেছিল। প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী এর বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ১ জানুয়ারি ২০২৩ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত। তবে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এবং আনুষঙ্গিক প্রস্তুতির কারণে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের দায়িত্বশীলরা এখন জানিয়েছেন যে, কাজ শুরু করতে দেরি হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হতে পারে। কিন্তু এই মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি প্রকল্পের গুণগত মান বা ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বরং সাশ্রয়ী উপায়ে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গত ২০ মে এই প্রকল্পের পূর্ত কাজের জন্য দুই হাজার ৫০৬ কোটি টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পের মূল অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল তিন হাজার ১০০ কোটি টাকা। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২০ শতাংশ লেস ধরে প্রায় ছয়শ কোটি টাকা কমিয়ে এই নতুন বাজেট অনুমোদন করেছে। এটি নিঃসন্দেহে সরকারি অর্থের সাশ্রয়ের একটি বড় উদাহরণ। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ তিনটি লটে বিভক্ত করা হয়েছে এবং যথাযথ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রথম লটে যৌথ উদ্যোগে মনিকো লিমিটেড বাংলাদেশ এবং চায়না রেলওয়ে নম্বর চার ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডকে এক হাজার ৯৯ কোটি ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ৪২৬ টাকায় কাজ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় লটের দায়িত্ব পেয়েছে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন, যাদের চুক্তিমূল্য আটশ ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৫১ হাজার ৮৩০ টাকা। তৃতীয় লটের ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগে কাজ পেয়েছে এনডিই বাংলাদেশ এবং আরবিসিজি চীন, যাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পাঁচশ ৮৯ কোটি নিরানব্বই লাখ নিরানব্বই হাজার নয়শ নিরানব্বই টাকা। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, যোগ্য এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সক্ষম হবে।
প্রকল্পটির বিস্তারিত নকশা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি সাধারণ মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং এটি একটি আধুনিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের রূপরেখা। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৪৭ দশমিক ১৩ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। ৪২ দশমিক ৯৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কের পেভমেন্ট নির্মাণের পাশাপাশি ৪২ দশমিক ৮০ লাখ ঘনফুট মাটির কাজ করা হবে। প্রকল্পের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ৩১টি কালভার্ট, তিনটি বড় সেতু, তিনটি ফ্লাইওভার, ছয়টি ওভারপাস, পাঁচটি আন্ডারপাস, চারটি ফুটওভার ব্রিজ, সাতটি পথচারী পারাপার এবং একটি আধুনিক টোল প্লাজা নির্মাণ করা হবে। এছাড়া পুরো মহাসড়কের উভয় পাশে ধীরগতির দুটি সার্ভিস লেন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যা স্থানীয় যানবাহন চলাচলের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।
সিলেটের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই প্রকল্পটিকে বেশ কিছু বিশেষ নকশা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গোলাপগঞ্জ পৌরশহরে ছয়শ মিটারের একটি দীর্ঘ ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি চারখাই ও হেতিমগঞ্জ বাজারে তিনশ মিটারের দুটি পৃথক ফ্লাইওভার এবং রানাপিং ও রামধা বাজারে ৫০ থেকে ৬০ মিটারের আরও দুটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে। কুশিয়ারা নদীর বর্তমান শেওলা সেতুর পাশেই নতুন একটি চার লেনের সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক জাহিদ হাসান জানিয়েছেন যে, প্রকল্পের ব্যয় কমলেও এর সামগ্রিক নকশায় বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে কিছু কৌশলগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবে গোলাপগঞ্জের পরে মহাসড়কের দুই পাশের সার্ভিস লেন বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা মূল সড়কের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
প্রকল্পের কাজ শুরুর সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারোয়ার আলম জানিয়েছেন, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের জায়গা অধিগ্রহণের ব্যস্ততার কারণে এই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ কাজে কিছুটা ধীরগতি ছিল। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, সংশ্লিষ্টদের সাথে নিয়মিত সমন্বয় সভার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের পথে। আগস্ট মাস শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওয়ার্ক অর্ডার প্রদানের মাধ্যমে দ্রুতই মাঠে পুরোদমে কাজ শুরু হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। বিয়ানীবাজার, দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলাসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। স্থলবন্দরের সাথে আধুনিক সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলে একদিকে যেমন পণ্য পরিবহন সহজ হবে, অন্যদিকে ব্যবসার প্রসার ঘটবে। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ঘুচে মানুষ নিরাপদ ও দ্রুততম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। সাশ্রয়ী ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্পটি আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল মাইলফলক হিসেবে টিকে থাকবে। সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এখন কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় রয়েছেন, যেখানে জনগণের প্রত্যাশা আর সরকারের দক্ষতার সমন্বয়ে রচিত হবে উন্নয়নের এক নতুন উপাখ্যান।


