প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে সংঘটিত এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা নাশকতামূলক যেকোনো কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করা হবে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার ভোরে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের হরিপুর করিচেরপুল এলাকায় ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল আকস্মিকভাবে মিছিল বের করে। অভিযোগ রয়েছে, মিছিলটি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। ভোরের নিরিবিলি সময়ে মহাসড়কে এমন ঝটিকা মিছিল স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিছিলের কয়েকটি ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি দ্রুত আলোচনায় আসে।
এ ঘটনায় জৈন্তাপুর মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে কয়েকজনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভিডিও ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি এবং স্থানীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তি হলেন জৈন্তাপুর উপজেলার পশ্চিম বালিপাড়া গ্রামের নিজাম উদ্দিনের ছেলে আল মারজান এবং লক্ষ্মীপ্রসাদ গ্রামের মৃত আকবর আলীর ছেলে সাইফুল ইসলাম রিপন। স্থানীয়ভাবে তারা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
থানা সূত্রে জানা গেছে, আল মারজানকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হরিপুর বাজার এলাকা থেকে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বুধবার সন্ধ্যায় চতুল বাজার এলাকায় সাইফুল ইসলাম রিপনকে আটক করা হয়। স্থানীয় সূত্র বলছে, উপজেলা ছাত্রদলের নেতা বদরুল আলম ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন নেতাকর্মী রিপনকে শনাক্ত করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সাইফুল ইসলাম রিপনকে ঘিরে এর আগেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির বিষয়টি সামনে এসেছে। জানা যায়, ঢাকায় একটি রাজনৈতিক মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তিনি পূর্বে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সেই মামলায় প্রায় সাত মাস কারাভোগের পর জামিনে বাড়ি ফেরেন। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, জামিনে মুক্ত হওয়ার পরও তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন এবং গোপনে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন।
এদিকে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জৈন্তাপুর ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুট হওয়ায় সেখানে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
জৈন্তাপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবর রহমান মোল্লা গণমাধ্যমকে বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জানান, এলাকায় নাশকতা কিংবা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির মতো যেকোনো কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বদা তৎপর রয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া দুজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ সংগঠনের ব্যানারে ঝটিকা মিছিল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক তৎপরতার খবর প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জৈন্তাপুর সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে যেকোনো অস্থিতিশীলতা দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক শুধু স্থানীয় যোগাযোগের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ ধরনের ঘটনায় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ জনমনে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করেছে।
অন্যদিকে মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি মনে করছেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমনের নামে যেন নিরীহ কেউ হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্বচ্ছ তদন্ত এবং নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখাও প্রয়োজন।
বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশি নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মিছিলে অংশ নেওয়া অন্যদের শনাক্তে কাজ চলছে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে।
এ ঘটনায় সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হলেও সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা, কোনোভাবেই যেন অস্থিরতা না বাড়ে। সীমান্তঘেঁষা এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।


