প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জে বিয়ের অনুষ্ঠানে ছবি ও ভিডিও ধারণের কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক তরুণ ফটোগ্রাফারকে ডেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে ছিনতাইয়ের ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে। ঘটনার এক মাসের বেশি সময় পর অভিযানে নেমে মামলার এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৯)। এই ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে সামাজিক যোগাযোগ, পেশাগত আস্থার সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সক্রিয়তার ভয়ংকর চিত্র।
র্যাব জানিয়েছে, মঙ্গলবার দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হরিনাপাটি এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে শাহিদ আলী নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হওয়া শাহিদ আলী সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হরিনাপাটি এলাকার বাসিন্দা এবং আক্কাস আলীর ছেলে। তিনি দস্যুতা মামলার এজাহারভুক্ত ২ নম্বর আসামি বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঘটনার শিকার তরুণ ফটোগ্রাফার জয়নাল আবেদীন মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার দক্ষিণ গোলগাঁও এলাকার বাসিন্দা। পেশাগতভাবে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিশেষ করে বিয়ে ও সামাজিক আয়োজনে ছবি ও ভিডিও ধারণের কাজ করেন। পরিচিতজনের সূত্রে কিংবা ফোনের মাধ্যমে কাজের প্রস্তাব পাওয়া তার জন্য নতুন কিছু ছিল না। কিন্তু এবার সেই পেশাগত বিশ্বাসই তাকে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
র্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন আগে এরশাদ নামের এক ব্যক্তি জয়নালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি সুনামগঞ্জে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ছবি ও ভিডিও ধারণের কাজের প্রস্তাব দেন। দূরত্ব এবং অপরিচিত জায়গা হওয়ায় প্রথমদিকে জয়নাল যেতে রাজি হননি। তবে একাধিকবার অনুরোধ এবং কাজের আশ্বাস পাওয়ার পর তিনি শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেন।
গত ১৫ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৮টার দিকে জয়নাল আবেদীন সুনামগঞ্জ শহরের পানসী রেস্টুরেন্টের সামনে পৌঁছান। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন এরশাদ। পরে তাকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে দোয়ারাবাজার থানার আমবাড়ি বাজার এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শাহিদ আলীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
এরপর রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিও পাল্টাতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, খেয়াঘাট পার হয়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের আদার বাজার সংলগ্ন হরিনাপাটি ঈদগাহ মাঠের পাশে পৌঁছানোর পর জয়নাল বুঝতে পারেন তিনি ফাঁদে পড়েছেন। র্যাবের ভাষ্যমতে, ওই সময় এরশাদ পেছন থেকে তার শার্টের কলার চেপে ধরেন এবং শাহিদ আলীসহ আরও একজন তার বুকে ধারালো চাকু ঠেকিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
এরপর তার সঙ্গে থাকা পেশাগত কাজের মূল্যবান সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ছিনতাই হওয়া জিনিসগুলোর মধ্যে ছিল একটি পেশাদার ক্যামেরা, তিনটি লেন্স, ক্যামেরা গ্রিপ, তিনটি ব্যাটারি, ক্যামেরা লাইট সেটআপ, ১২৮ জিবি মেমোরি কার্ড, একটি মোবাইল ফোন, চার্জার এবং নগদ ১১ হাজার ৫০০ টাকা। সবকিছু নেওয়ার পর তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
ঘটনার পর আতঙ্কিত অবস্থায় স্থানীয়দের সহায়তায় নিরাপদ স্থানে পৌঁছে জয়নাল। পরে তিনি সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পর থেকেই র্যাব-৯ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। প্রযুক্তিগত নজরদারি, স্থানীয় তথ্য সংগ্রহ এবং গোপন অনুসন্ধানের মাধ্যমে অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়।
র্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে অপরাধীরা সামাজিক যোগাযোগ, মোবাইল ফোন কিংবা পেশাগত পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ তৈরি করছে। বিশেষ করে ফটোগ্রাফার, অনলাইন ব্যবসায়ী, ডেলিভারি কর্মী কিংবা ফ্রিল্যান্স পেশাজীবীদের লক্ষ্য করে প্রতারণা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। ফলে কাজের প্রস্তাব পেলেও পরিচয় যাচাই এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া শাহিদ আলীকে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। র্যাব-৯ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, ছিনতাই ও দস্যুতা মামলাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র্যাবের গোয়েন্দা তৎপরতাও চলমান রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় এখন অনলাইন ও মোবাইলভিত্তিক প্রতারণা এবং পরিকল্পিত ছিনতাইয়ের প্রবণতা বাড়ছে। অপরিচিত লোকের ডাকে নির্জন এলাকায় যাওয়া কিংবা যথাযথ পরিচয় যাচাই না করে কাজ নিতে গিয়ে অনেকেই ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্স পেশাজীবী ও তরুণ উদ্যোক্তারা সহজেই প্রতারকদের টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পেশাগত দায়িত্ব ও আয়ের চাপে অনেক তরুণ নিরাপত্তার বিষয়টি অবহেলা করেন। অপরাধীরা সেই সুযোগই কাজে লাগায়। তাই যেকোনো কাজের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় যাচাই, অবস্থান নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে সহকর্মী বা পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে যাওয়া উচিত।
সুনামগঞ্জের এই ঘটনা শুধু একটি ছিনতাই নয়, বরং পেশাগত আস্থার অপব্যবহারের একটি ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবেও দেখছেন অনেকে। একজন তরুণ ফটোগ্রাফারের ক্যামেরা ও সরঞ্জামই তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন। সেই সরঞ্জাম হারানোর অর্থ শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং তার স্বপ্ন, পরিশ্রম ও পেশাগত ভবিষ্যতের ওপরও বড় আঘাত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে পেশাগত সুযোগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপরাধচক্রের ফাঁদে আর কেউ না পড়েন।


