প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জরুরি মুহূর্তে সচেতনতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা একটি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। আগুন, দুর্ঘটনা, শ্বাসরোধ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—যেকোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সিলেটের মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী “প্রাথমিক চিকিৎসা ও দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া ক্যাম্প”। শিক্ষার্থীদের জরুরি পরিস্থিতিতে দক্ষ ও মানবিকভাবে প্রস্তুত করে তুলতে আয়োজিত এই ক্যাম্প অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বুধবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত এ কর্মসূচির উদ্যোগ নেয় মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি রোভার স্কাউট গ্রুপ। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলা এই ক্যাম্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও রোভার সদস্যরা অংশ নেন। পুরো ক্যাম্পজুড়ে ছিল প্রাণবন্ত পরিবেশ, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ এবং বাস্তবধর্মী অনুশীলনের সমন্বয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের সংকট মোকাবিলায়ও প্রস্তুত করে তুলতে এ ধরনের কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে দেশে সাম্প্রতিক সময়ে অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তরুণদের মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও উদ্ধার কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
এই ক্যাম্পে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি বিশেষজ্ঞ দল প্রশিক্ষক হিসেবে অংশ নেয়। তারা অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সাড়া দিতে হয়, সে বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা দেন। শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং বাস্তব পরিস্থিতির অনুকরণে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো সহজভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হন।
দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে রক্তচাপ মাপার মেশিন পরিচালনা থেকে শুরু করে ফার্স্ট এইড বক্সের সঠিক ব্যবহার শেখানো হয়। বিভিন্ন ধরনের ব্যান্ডেজ প্রয়োগ, আহত ব্যক্তিকে নিরাপদে বহনের কৌশল, অজ্ঞান রোগীর প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা এবং শ্বাসরোধের সময় ব্যবহৃত হিমলিক ম্যানুভার পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রদর্শন করা হয়। প্রশিক্ষকরা সিপিআর বা কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন পদ্ধতিও শেখান, যা হৃদ্রোগে আক্রান্ত বা শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত কার্যকর।
এছাড়া আগুন লাগার সময় করণীয়, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহারের কৌশল এবং ভূমিকম্প বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয় ও উদ্ধার কার্যক্রম সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের একটি অংশে অংশগ্রহণকারীদের বাস্তব পরিস্থিতির মতো করে অনুশীলন করানো হয়, যাতে তারা শুধু শুনে নয়, বাস্তবভাবে বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে পারেন।
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী অনেক শিক্ষার্থী জানান, এ ধরনের কর্মসূচি তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। তারা মনে করেন, জরুরি মুহূর্তে কীভাবে একজন মানুষকে সাহায্য করতে হয়, তা বই পড়ে পুরোপুরি শেখা সম্ভব নয়। হাতে-কলমে প্রশিক্ষণই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর। একজন শিক্ষার্থী বলেন, “আগে শুধু নাম শুনেছি সিপিআর বা হিমলিক ম্যানুভারের। কিন্তু আজ বাস্তবে শিখতে পেরে মনে হচ্ছে জরুরি পরিস্থিতিতে অন্তত কারও পাশে দাঁড়াতে পারব।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারাও এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, বর্তমান সময়ে তরুণদের শুধু পেশাগত দক্ষতা অর্জন করলেই হবে না, মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধও গড়ে তুলতে হবে। দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনার সময় একজন সচেতন তরুণ অনেক মানুষের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান এমিরেটাস ড. তৌফিক রহমান চৌধুরী এবং চেয়ারম্যান তানভীর এম রহমান চৌধুরী। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলি বিকাশ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সবসময়ই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে।
ক্যাম্পের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন গ্রুপ সভাপতি অধ্যাপক শেখ আশরাফুর রহমান, রোভার স্কাউট লিডার ও গ্রুপ সম্পাদক মো. আমজাদ হোসেন এবং গার্ল-ইন-রোভার স্কাউট লিডার ওয়াদিয়া ইকবাল চৌধুরী। আয়োজকরা জানান, ভবিষ্যতেও এ ধরনের সচেতনতামূলক ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নগরায়ণ, অগ্নিকাণ্ড ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন ও প্রস্তুত হতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক এ ধরনের প্রশিক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু দক্ষই করবে না, বরং সমাজে মানবিক সহায়তার সংস্কৃতিও শক্তিশালী করবে।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব তৈরি করতে রোভার স্কাউট কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, দলগত কাজ, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের মতো গুণাবলি বিকাশে সহায়ক হয়।
ক্যাম্পে অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থীই ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এমন আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই নয়, স্কুল-কলেজ পর্যায়েও এ ধরনের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। কারণ দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা কখনো বলে আসে না, আর সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই অনেক সময় জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দেয়।
দিনশেষে অংশগ্রহণকারীদের চোখেমুখে ছিল নতুন শেখার আনন্দ এবং আত্মবিশ্বাসের ছাপ। মানবিকতা, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এই আয়োজন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা, তেমনি সমাজের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা।


