প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করা হলেও নিহতের পরিবার দাবি করেছে, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ছেলেকে হত্যা করে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে অভিযোগ এনে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন নিহত যুবকের মা।
সম্প্রতি সুনামগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেন তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের মৃত শফিকুল ইসলামের স্ত্রী সরুফা আক্তার। মামলায় নিহত শ্যামল মিয়ার স্ত্রী সুমা আক্তারসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন নোয়াগাঁও গ্রামের ইমরান মিয়া, সারোয়ার হোসেন, আকিক মিয়া, শামীম মিয়া, আঙ্গুরা বেগম এবং ইসলামপুর গ্রামের সুজন মিয়া।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, নিহত শ্যামল মিয়া (২২) দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে জড়িয়ে ছিলেন। এ নিয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব চলছিল এবং বিভিন্ন সময় তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। জীবিকার তাগিদে নিহতের মা সরুফা আক্তার ঢাকার গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। সেই সুযোগে গ্রামের বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন শ্যামল।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২ এপ্রিল। ওইদিন সকালে মোবাইল ফোনে ছেলের মৃত্যুর খবর পান সরুফা আক্তার। তড়িঘড়ি করে ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তাহিরপুর থানা পুলিশ শ্যামলের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠিয়েছে। শুরুতে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও পরে বিভিন্ন তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্যে তার মনে সন্দেহ তৈরি হয়।
বাদীর দাবি, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে শ্যামলকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর জন্য মরদেহ ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার দিন অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধভাবে শ্যামলকে মারধর করে এবং পরে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর আইনি জটিলতা এড়াতে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়।
নিহতের স্ত্রী সুমা আক্তারের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের মা। তার অভিযোগ, ঘটনার আগের দিন সুমা আক্তার বাবার বাড়ি বা অন্য কোথাও বেড়াতে গিয়ে রাত কাটান। পরদিন সকালে এসে স্বামীর ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান বলে দাবি করেন। কিন্তু ঘটনার সময় তার অনুপস্থিতি এবং পরবর্তী আচরণ পরিবারের মধ্যে গভীর সন্দেহের জন্ম দেয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, শ্যামলের সঙ্গে জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার এলাকায় উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়েছিল। তবে তারা কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। কারণ, মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন এবং এলাকায় এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
নিহতের মা সরুফা আক্তার অভিযোগ করেন, ছেলের মৃত্যুর পর মামলা না করার জন্য তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করা হয়। এমনকি স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের চাপে ১৪ এপ্রিল থানায় একটি অপমৃত্যুর আবেদন করতেও বাধ্য করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। পরে বিভিন্ন তথ্য ও স্থানীয়দের বক্তব্য শুনে তিনি নিশ্চিত হন, তার ছেলে আত্মহত্যা করেননি বরং তাকে হত্যা করা হয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সরুফা আক্তার বলেন, “আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। জমি দখলের জন্য আমার বুক খালি করে দিয়েছে। আমি এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।” তার এই আর্তনাদ স্থানীয়দের মধ্যেও আবেগের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই বলছেন, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে মামলার পর এলাকায় আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ এটিকে পারিবারিক বিরোধের ভয়াবহ পরিণতি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে রাজি নন।
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শ্যামল নামের এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় তার মায়ের করা আবেদনের ভিত্তিতে আগে একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল। এখন আদালতে নতুন করে হত্যা মামলা দায়ের করা হলে আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, তদন্তে যেসব তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলোর ভিত্তিতেই আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এমন ঘটনায় ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক রিপোর্ট, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে যদি পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তদন্ত সংস্থাকে আরও সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হয়।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় সহিংস ঘটনা ঘটে থাকে। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার অভিযোগও ওঠে। তাই আইনের শাসন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা ছাড়া এমন ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান সম্ভব নয়।
তাহিরপুরের এই ঘটনাও এখন স্থানীয় মানুষের কাছে বড় এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এটি কি সত্যিই আত্মহত্যা ছিল, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমে। তবে নিহতের মায়ের কান্না আর বিচারের আকুতি ইতোমধ্যেই পুরো এলাকায় গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।


