প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় আবারও প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে গেল একটি তাজা প্রাণ। সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের মাদ্রাসাপাড়া এলাকায় ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে আব্দুল্লাহ (৩৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত তিনজন। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে একই এলাকায় আরেকটি দুর্ঘটনার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে উপজেলার মাদ্রাসাপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আব্দুল্লাহ উপজেলার উজানীগাঁও গ্রামের ছলিম মিয়ার ছেলে। আহতদের মধ্যে রয়েছেন জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের মৃত ইন্তাজ উল্লার ছেলে ফরিদ আহমদ, হারুন মিয়ার ছেলে জাবেদ আহমদ এবং আরও একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি। আহতদের স্থানীয়ভাবে উদ্ধার করে শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্ঘটনার শিকার সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি আস্তমা গ্রাম থেকে পাগলা বাজারের দিকে যাচ্ছিল। রাতের দিকে পাগলা মাদ্রাসাপাড়া এলাকায় পৌঁছানোর পর পেছন দিক থেকে দ্রুতগতির একটি মালবোঝাই ট্রাক সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় মুহূর্তেই দুমড়ে-মুচড়ে যায় সিএনজিটি। ঘটনাস্থলেই মারা যান আব্দুল্লাহ। আহতদের চিৎকারে আশপাশের মানুষ দ্রুত ছুটে এসে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্ঘটনার পরপরই মহাসড়কে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় আহতরা সড়কের পাশে ছটফট করছিলেন। অনেকেই নিজেদের গাড়ি থামিয়ে আহতদের হাসপাতালে নিতে এগিয়ে আসেন। স্থানীয় যুবকরাই প্রথম উদ্ধারকাজে অংশ নেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিহতের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল এলাকা ভারী হয়ে ওঠে।
নিহত আব্দুল্লাহ সম্পর্কে স্থানীয়রা জানান, তিনি পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। জীবিকার তাগিদে নিয়মিত যাতায়াত করতেন বিভিন্ন এলাকায়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তার মৃত্যু পরিবারটিকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, ছোট ছোট সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে তার পরিবার এখন অসহায় হয়ে পড়েছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের শান্তিগঞ্জ অংশে দীর্ঘদিন ধরেই বেপরোয়া যান চলাচল, অতিরিক্ত গতি এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার কারণে দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় ভারী যানবাহনের দৌরাত্ম্য আরও বেশি দেখা যায়। অনেক ট্রাকচালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর পাশাপাশি ট্রাফিক আইনও মানেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বেড়েছে কারণ মাত্র কয়েক দিন আগেও প্রায় একই এলাকায় আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। গত শুক্রবার রাতে আস্তমা রাস্তার মুখ এলাকায় আরেকটি সড়ক দুর্ঘটনায় কয়েকজন আহত হন। অল্প সময়ের ব্যবধানে একই এলাকায় একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, সড়কটিতে দ্রুতগতির যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ মোড় ও বাজারসংলগ্ন এলাকায় স্পিড ব্রেকার স্থাপন, পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং ট্রাফিক নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা। স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি না থাকলে ভবিষ্যতেও এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে ছোট যানবাহন ও ভারী যানবাহনের একসঙ্গে চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা তুলনামূলক দুর্বল যান হওয়ায় বড় ট্রাক বা বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটে। এছাড়া রাতের বেলায় অপর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং চালকদের ক্লান্তিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন একটি বড় জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, চালকদের প্রশিক্ষণ, সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওলী উল্লাহ দুর্ঘটনায় একজন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনগুলো জব্দেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলের মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছেন, একই এলাকায় বারবার প্রাণহানির পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কান্না যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে—এমন প্রত্যাশাই স্থানীয়দের।


