সিলেট সীমান্তে বারবার পিছু হটেছে বিএসএফ

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেট সীমান্তে গত প্রায় আড়াই দশকের ইতিহাসে কয়েকবার উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও প্রতিবারই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও প্রতিরোধের মুখে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে পিছু হটতে হয়েছে বলে দাবি উঠেছে। সর্বশেষ গত সোমবার (১৮ মে) সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনার হাট সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হলে আবারও আলোচনায় আসে সীমান্তে বিজিবির প্রতিরোধের বিষয়টি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই দিন বিকেলে সোনার হাট সীমান্ত এলাকায় হঠাৎ করে বিনা উস্কানিতে বিএসএফের সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরের দিকে গুলি ছোড়ে বলে অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা জবাব দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবি সদস্যদের কড়া অবস্থানের মুখে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয় বলে স্থানীয় সূত্র এবং সীমান্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ঘটনার পর বিজিবি সিলেট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন, সীমান্তে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। তিনি জানান, পেশাদার ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত ও স্থিতিশীল রয়েছে।

সীমান্তের এই সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন হলেও সিলেট অঞ্চলে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে সংঘর্ষ বা উত্তেজনার ইতিহাস নতুন নয়। গত ২৬ বছরে অন্তত চারটি বড় ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছিল দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এবং রক্তক্ষয়ী ঘটনা ছিল ২০০১ সালের পদুয়া সীমান্ত সংঘর্ষ। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার তামাবিল সীমান্তের পদুয়া এলাকায় ওই বছরের ১৬ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত টানা সংঘর্ষ চলে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) এবং বিএসএফের মধ্যে। সীমান্ত ইতিহাসে ঘটনাটি এখনো অন্যতম বড় সামরিক উত্তেজনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

তৎকালীন সূত্র অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে নো-ম্যানস ল্যান্ড এলাকায় বিএসএফ পাকা রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ১৬ এপ্রিল রাতে বিডিআর সদস্যরা বিএসএফের একটি ক্যাম্প ঘিরে ফেলে এবং পুরো এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর কয়েকদিন ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি চলে। সংঘর্ষে বিএসএফের ১৬ সদস্য নিহত হন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। অন্যদিকে বিডিআরের তিন সদস্যও প্রাণ হারান। পরে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

সীমান্তবাসীর কাছে সেই সংঘর্ষ আজও স্মৃতির অংশ হয়ে আছে। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় পুরো সীমান্ত এলাকা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। দিন-রাত গোলাগুলির শব্দে মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। তবে সীমান্ত রক্ষায় বিডিআরের অবস্থান স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সাহস ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল বলেও তারা স্মরণ করেন।

এরপর ২০০৬ সালে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্তে। বারঠাকুরী এলাকার প্রায় ২৯৬ একর জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ওই বছরের ৯ আগস্ট রাতে বিএসএফ সদস্যরা অতর্কিত আক্রমণ চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়ভাবে চাষাবাদ করা ওই জমির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হলে বিডিআর সদস্যরা তা প্রতিহত করতে মাঠে নামে।

সেই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের মধ্যে টানা প্রায় ১২ ঘণ্টা গোলাগুলি চলে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে বিএসএফ মেশিনগান এবং মর্টার শেল ব্যবহার করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। সংঘর্ষে দুই বিডিআর সদস্য ও সাতজন বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিক আহত হন। অন্যদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছিল, বিডিআরের গুলিতে আসামের কাছাড় জেলার দুই নারী নিহত হয়েছিলেন। পরে উভয় দেশের কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়।

সীমান্তে তৃতীয় বড় উত্তেজনার ঘটনা ঘটে ২০০৯ সালে জৈন্তাপুর এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, বিএসএফ ডিবির হাওর এলাকায় বাংলাদেশি কৃষকদের চাষাবাদে বাধা দেয় এবং শাপলা বিলের প্রায় ৮০ একর জমি দখলের চেষ্টা করে। এ ঘটনায় বিডিআর সদস্যরা কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দুই বাহিনীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি গুলিবিনিময়ের একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হটে বলে সীমান্ত সূত্রে জানা যায়।

সীমান্ত বিশ্লেষকরা বলছেন, সিলেট সীমান্তের ভৌগোলিক অবস্থান, নদী, পাহাড় এবং বিস্তীর্ণ সীমান্তরেখার কারণে এই অঞ্চল বরাবরই স্পর্শকাতর। অনেক এলাকায় সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, জমি নিয়ে বিরোধ এবং স্থানীয় মানুষের চলাচলকে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যেই উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে দ্রুত যোগাযোগের কারণে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে অধিকাংশ সময়।

এদিকে সাম্প্রতিক সোনার হাট সীমান্তের ঘটনাকে ঘিরে সীমান্ত এলাকায় আবারও সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে থাকেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক এবং সীমান্তসংলগ্ন গ্রামের পরিবারগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তাই তারা স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে উত্তেজনা নিরসনে কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং দুই দেশের পারস্পরিক কূটনৈতিক সংলাপ ও আস্থার সম্পর্ক আরও জোরদার করা জরুরি। সীমান্ত হত্যা, গুলি বিনিময় এবং জমি নিয়ে বিরোধ কমাতে যৌথ সমন্বয়মূলক পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সীমান্তে যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী অতীতের মতোই প্রস্তুত রয়েছে—সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই বার্তাই নতুন করে উঠে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

বাড়ির আঙিনায় গাঁজা চাষ, গ্রেফতার ১

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কুলাউড়ায় ফায়ার সার্ভিস সপ্তাহের উদ্বোধন

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জে ‘মিরর’ দোকান নিয়ে ক্রেতাদের ক্ষোভ

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জে বিয়ের দাওয়াতে ডেকে ফটোগ্রাফারকে ছিনতাই

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ সুরমায় রেললাইনে নারীর মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

বাড়ির আঙিনায় গাঁজা চাষ, গ্রেফতার ১

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কুলাউড়ায় ফায়ার সার্ভিস সপ্তাহের উদ্বোধন

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জে ‘মিরর’ দোকান নিয়ে ক্রেতাদের ক্ষোভ

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জে বিয়ের দাওয়াতে ডেকে ফটোগ্রাফারকে ছিনতাই

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ সুরমায় রেললাইনে নারীর মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কানাইঘাটে প্রভাবশালীদের দখলে অবৈধ পশুর হাট

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটের মাটির নিচে মিলল বিপুল শিলাসম্পদ

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ