প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জীবিকার সন্ধানে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সাইদুর মিয়া। পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আশায় চলতি বছরের শুরুতে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই স্বপ্ন থেমে যায় প্রবাসের মাটিতেই। অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এই প্রবাসী শ্রমিক। এরপর শুরু হয় আরেক কঠিন বাস্তবতা—মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম। আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত মানবিক উদ্যোগ ও জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে সম্পূর্ণ বিনা খরচে দেশে ফিরেছে তার মরদেহ।
ঘটনাটি ঘটেছে বানিয়াচং উপজেলার ১নং উত্তর-পূর্ব ইউনিয়নের কামালখানী মহল্লায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আব্দুজ জাহের মিয়ার ছেলে সাইদুর মিয়া চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে যান। মধ্যপ্রাচ্যের কঠিন কর্মপরিবেশে নিজের ভাগ্য বদলের আশায় তিনি সেখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়ার সময় তার স্বপ্ন ছিল সন্তানদের ভালো ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা এবং পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট দূর করা।
কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার কিছুদিন পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন সাইদুর মিয়া। প্রথমে সাধারণ শারীরিক সমস্যা মনে হলেও পরে তার জন্ডিস ধরা পড়ে। অবস্থার অবনতি হলেও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা নিতে পারেননি তিনি। ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে গত ৯ এপ্রিল সৌদি আরবেই মৃত্যুবরণ করেন এই প্রবাসী।
তার মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছালে পরিবারে নেমে আসে গভীর শোক। স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কিন্তু শোকের মধ্যেও পরিবারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার খরচ। বিদেশ থেকে মরদেহ আনতে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, তা সংগ্রহ করার সামর্থ্য ছিল না পরিবারটির। এমন পরিস্থিতিতে স্বজনরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন মহলের সহায়তা কামনা করেন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, পরে বিষয়টি প্রতিমন্ত্রী ভিপি নূরুল হক নুর এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. সাখাওয়াত জীবনের নজরে আসে। তারা দ্রুত সৌদি আরব ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অবশেষে সাইদুর মিয়ার মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে সম্পূর্ণ বিনা খরচে।
মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। দীর্ঘদিন পর প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো দেখতে পেরে পরিবারের সদস্যরা যেমন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, তেমনি মানবিক সহায়তা পাওয়ায় কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।
সাইদুর মিয়ার এক স্বজন বলেন, পরিবারের পক্ষে মরদেহ দেশে আনার কোনো উপায় ছিল না। অনেক চেষ্টা করেও প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছিল না। তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিরা পাশে না দাঁড়ালে হয়তো আমরা শেষবারের মতো তাকে দেখতে পেতাম না। তাদের এই সহযোগিতা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়তা হয়ে থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনাটিকে মানবিকতার উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখলেও বিদেশের মাটিতে তারা নানা ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটান। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা মৃত্যুর মতো পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। এমন সময়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দ্রুত সহযোগিতা একটি পরিবারের জন্য বড় আশীর্বাদ হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর কোটি কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছেন তারা। কিন্তু বিদেশে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন অনেক শ্রমিক। পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়া, কর্মপরিবেশের চাপ, আর্থিক সংকট এবং আইনি জটিলতা তাদের জীবনে বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য আরও কার্যকর সুরক্ষা ও সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে অসুস্থতা বা মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার। কারণ অনেক দরিদ্র পরিবার প্রবাসী স্বজনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতেও হিমশিম খায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সাইদুর মিয়া ছিলেন শান্ত স্বভাবের পরিশ্রমী মানুষ। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। তার আকস্মিক মৃত্যু এলাকায় অনেককে নাড়া দিয়েছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, বিদেশে গিয়ে মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত হতে পারে, এই ঘটনাই তার বাস্তব উদাহরণ।
এদিকে এলাকাবাসী আশা করছেন, ভবিষ্যতেও অসহায় প্রবাসী পরিবারগুলোর পাশে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা একইভাবে মানবিক ভূমিকা পালন করবেন। কারণ একটি মরদেহ শুধু একজন মানুষের নিথর দেহ নয়, সেটি একটি পরিবারের শেষ স্মৃতি, শেষ বিদায় এবং আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর বাস্তবতা।
বানিয়াচংয়ের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রবাসজীবনের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক স্বপ্নই থাকে না, থাকে সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা এবং অনেক সময় হৃদয়বিদারক পরিণতিও। আর সেই কঠিন সময়ে মানবিক সহায়তার একটি হাত একটি শোকাহত পরিবারের জন্য হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় ভরসা।


