প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন শাহ আরেফিন-অদ্বৈত মৈত্রী সেতুর পাঁচটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। বহু প্রতীক্ষিত এই সেতু ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই ছিল হতাশা, ধীরগতির নির্মাণকাজ এবং সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ার অভিযোগ। তারই মধ্যে ঝড়ের রাতে গার্ডার ধসের ঘটনায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রবিবার দিবাগত রাতে বয়ে যাওয়া ঝড়ের পর সোমবার সকালে স্থানীয়রা প্রথম দেখতে পান সেতুর কয়েকটি গার্ডার নদীতে পড়ে আছে। পরে বিষয়টি দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অনেকে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, এত বড় একটি সেতুর গার্ডার যদি একটি ঝড়েই ভেঙে পড়ে, তাহলে নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছেন পাঁচটি গার্ডার নদীতে পড়ে গেছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, রাতে এলাকায় ঝড় হয়েছিল। তবে প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আরও তদন্ত প্রয়োজন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সেতুর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য ইতোমধ্যে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু নতুন এই দুর্ঘটনা পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যাদুকাটা নদী শুধু একটি নদী নয়, তাহিরপুর ও আশপাশের মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি স্থায়ী সেতু। কারণ বর্ষাকালে নদী পারাপারে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি জরুরি প্রয়োজনে চলাচলও অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই বাস্তবতায় শাহ আরেফিন-অদ্বৈত মৈত্রী সেতু ঘিরে স্থানীয়দের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সেই স্বপ্ন এখন যেন অনিশ্চয়তার চক্রে আটকে আছে।
নদীপাড়ের গড়কাটি গ্রামের বাসিন্দা আলাউদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মানুষ বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছে কবে সেতুটি চালু হবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেছেন গার্ডার নদীতে পড়ে আছে। তার প্রশ্ন, একটি ঝড়ে যদি সেতুর গার্ডার ভেঙে যায়, তাহলে এত বড় প্রকল্পের নির্মাণমান কতটা শক্তিশালী ছিল? স্থানীয়দের অনেকেই একই ধরনের প্রশ্ন তুলছেন। তারা বলছেন, ঝড়ে গ্রামের ছোটখাটো স্থাপনাও যেখানে অক্ষত ছিল, সেখানে বিশাল গার্ডার নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা সহজভাবে নেওয়া যায় না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মতে, সেতুটি চালু হলে তাহিরপুর ও সীমান্তবর্তী এলাকার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ছিল। পর্যটন, পাথর ব্যবসা, কৃষিপণ্য পরিবহনসহ নানা খাতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা ছিল। বিশেষ করে যাদুকাটা নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটন শিল্প আরও গতিশীল হতে পারত। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের অভিযোগে প্রকল্পটি এখন অনেকের কাছেই হতাশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৫০ মিটার দীর্ঘ শাহ আরেফিন-অদ্বৈত মৈত্রী সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। তমা কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটির দায়িত্ব পায়। শুরুতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কাজের গতি ছিল খুবই ধীর। কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পরও প্রকল্পটি শেষ হয়নি। শেষ পর্যন্ত কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সরে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ অবস্থায় নতুন করে রি-টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কিন্তু পুনরায় কাজ শুরু হওয়ার আগেই গার্ডার ধসের এই ঘটনা পুরো প্রকল্পকে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গার্ডার ধসের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে কারিগরি তদন্ত প্রয়োজন। নির্মাণ উপকরণের মান, সংরক্ষণ পদ্ধতি, স্থাপন প্রক্রিয়া কিংবা আবহাওয়ার প্রভাব—সবকিছুই খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ ভবিষ্যতে সেতুটি ব্যবহারের সময় যেন কোনো ধরনের ঝুঁকি না থাকে, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে নির্মাণখাতে জবাবদিহিতা ও তদারকির অভাবের সমালোচনা করছেন। কেউ কেউ বলছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যয় বৃদ্ধি, সময়ক্ষেপণ এবং নিম্নমানের কাজের অভিযোগ। যাদুকাটা নদীর এই সেতু দুর্ঘটনাও সেই বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশ বলছেন, সীমান্তবর্তী এলাকার উন্নয়নের জন্য এই সেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্রুত তদন্ত করে দায় নির্ধারণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা দাবি করছেন, নতুন করে কাজ শুরুর আগে পুরো প্রকল্পের গুণগত মান পরীক্ষা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
তাহিরপুর অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন একটাই—বহু প্রতীক্ষিত সেতুটি যেন আর অনিশ্চয়তার জালে আটকে না থাকে। প্রতিদিন নদী পারাপারের কষ্ট, বর্ষার দুর্ভোগ আর উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়ার বাস্তবতা তাদের দীর্ঘদিনের সঙ্গী। সেই কষ্টের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি নিয়েই শুরু হয়েছিল শাহ আরেফিন-অদ্বৈত মৈত্রী সেতুর কাজ। কিন্তু গার্ডার ধসের এই ঘটনায় মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন জেগেছে—আসলে কবে শেষ হবে এই অপেক্ষা?
বর্তমানে নদীতে পড়ে থাকা গার্ডারগুলো উদ্ধার এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। স্থানীয়দের আশা, এবার অন্তত দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই সেতু আর অবহেলার প্রতীক হয়ে না থাকে।


