প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, শিডিউল বিপর্যয় ও ধীরগতির যাত্রার অবসান ঘটাতে নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে ডুয়েল গেজ ডাবল রেললাইন প্রকল্প। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই রুটে আধুনিক রেল অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন সিলেটবাসী। ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রুটকে ডাবল লাইনে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু যাত্রীসেবাই নয়, বদলে যেতে পারে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প খাতের চিত্রও।
বর্তমানে সিলেটের রেলপথ এখনো পুরোনো মিটারগেজ সিঙ্গেল লাইনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি ট্রেন চলাচলের সময় বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রেনকে পাশ কাটানোর জন্য বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলম্ব যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট রুটে যাত্রীদের প্রায়ই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। যাত্রীদের অভিযোগ, ট্রেন ভ্রমণ তুলনামূলক নিরাপদ ও আরামদায়ক হলেও সময় অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে সড়কপথ বেছে নিচ্ছেন।
রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাবল লাইন চালু হলে একই সময়ে দুই দিক থেকে ট্রেন চলাচল সম্ভব হবে। এতে ক্রসিংজনিত অপেক্ষা কমবে, শিডিউল বিপর্যয় হ্রাস পাবে এবং ট্রেনের গতি বাড়বে। একই সঙ্গে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও আসবে নতুন গতি। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের চা শিল্প, পাথর ব্যবসা ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য পরিবহনে রেলপথ আরও কার্যকর হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঐতিহাসিকভাবে সিলেটের রেল যোগাযোগের গুরুত্ব অনেক পুরোনো। ব্রিটিশ শাসনামলে চা শিল্পের বিকাশ ও পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে ১৯১২ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে চালু করা হয় কুলাউড়া-সিলেট রেললাইন। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে সিলেট-ছাতক রুট চালু হলে এই অঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হয়। তখন থেকেই সিলেট রেলওয়ে স্টেশন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্রে পরিণত হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেলপথের অবকাঠামো উন্নয়ন সেভাবে এগোয়নি। পুরোনো লাইন, সীমিত ইঞ্জিন এবং অব্যবস্থাপনার কারণে রেলসেবার মান কমতে থাকে। এর মধ্যে করোনা মহামারির সময় বন্ধ হয়ে যায় ছাতক রুটে ট্রেন চলাচল। পরে ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিভিন্ন রেললাইন ও অবকাঠামো। এখনো অনেক অংশ পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে সিলেট অঞ্চলের রেল যোগাযোগ সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
২০০৪ সালে আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুন রূপ পায় সিলেট রেলওয়ে স্টেশন। কদমতলীতে অবস্থিত এই স্টেশন বর্তমানে ঢাকা ও ছাতকের সঙ্গে মিটারগেজ লাইনে সংযুক্ত রয়েছে। প্রতিদিন শত শত যাত্রী এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। যাত্রীদের অভিযোগ, ট্রেনের সংখ্যা কম হওয়ায় টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে যাত্রাপথে দুর্ভোগও বাড়ছে।
বর্তমানে সিলেট-ঢাকা রুটে চারটি এবং সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে দুটি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করছে। সব মিলিয়ে মাত্র ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে সিলেটের রেল যোগাযোগ। অথচ একসময় লোকাল, মেইল ও পণ্যবাহী ট্রেনসহ প্রতিদিন ২০ থেকে ২২টি ট্রেন চলাচল করত। রেল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল। এছাড়া ইঞ্জিন সংকটের কারণে তেলবাহী ট্রেনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে প্রতিদিন আন্তঃনগর ট্রেনে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ যাত্রী যাতায়াত করছেন।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সরকার ইতোমধ্যে ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রুটকে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করেছে। ডুয়েল গেজ ব্যবস্থা চালু হলে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ—দুই ধরনের ট্রেনই একই লাইনে চলাচল করতে পারবে। এর ফলে সারা দেশের রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সিলেটের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে সিলেটের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
সম্প্রতি ডাবল লাইনের দাবিতে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে মানববন্ধন করেছেন সচেতন নাগরিক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা। তাদের দাবি, এই প্রকল্প শুধু যাত্রীসেবার উন্নয়ন নয়, বরং পুরো সিলেট অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, উন্নত রেল যোগাযোগ চালু হলে পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে চা-বাগান, জাফলং, রাতারগুল ও বিছানাকান্দির মতো পর্যটন এলাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকদের যাতায়াত আরও সহজ হবে।
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার নূরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, বর্তমানে ঢাকা-সিলেট রুটে যাত্রা করতে অন্তত আট ঘণ্টা সময় লাগে। ডাবল লাইন চালু হলে তা এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত কমে আসতে পারে। তিনি বলেন, “ডাবল লাইন সিলেটের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হবে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে এবং ট্রেন পরিচালনা আরও সহজ হবে।”
টিকিট কালেক্টর রায়হান বিন ইসলামও একই ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, বর্তমানে ট্রেন ক্রসিংয়ের কারণে প্রায়ই দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়। ডাবল লাইন হলে যাত্রীদের সময় বাঁচবে, টিকিটের চাহিদা বাড়বে এবং ট্রেনের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে।
সম্প্রতি সিলেট সফরে এসে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, সিলেট-ঢাকা-চট্টগ্রাম ডুয়েল গেজ রেললাইন চালুর লক্ষ্যে সমীক্ষা চলছে। তিনি বলেন, সরকার যাত্রীসেবার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে ইঞ্জিন সংকট নিরসনে কাজ করা হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশ রেলওয়েকে লাভজনক ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য উন্নত রেল যোগাযোগ এখন সময়ের দাবি। সড়কপথে বাড়তি চাপ কমাতে এবং নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন নিশ্চিত করতে রেল ব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। সেই দিক থেকে সিলেটের জন্য ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন প্রকল্প একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।
দীর্ঘদিনের অবহেলা, শিডিউল বিপর্যয় ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা সিলেটের রেল যোগাযোগ এখন নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু যাত্রীদের ভোগান্তিই কমবে না, বরং সিলেট অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে আসবে নতুন গতি। তাই এখন সিলেটবাসীর প্রত্যাশা, বহু প্রতীক্ষিত এই উদ্যোগ যেন আর কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তব রূপ পায়।


