পাহাড়ি ঢলে বাড়ছে নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেটে স্থানীয়ভাবে ভারী বৃষ্টিপাত না হলেও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দ্রুত বাড়ছে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি। সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে জেলার প্রায় সব নদ-নদীর পানির উচ্চতা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ বলছে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে সিলেটের নিম্নাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রোববার (১৭ মে) বিকেলে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকাশিত পানি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, জেলার সবকটি প্রধান নদীর পানির উচ্চতা আগের দিনের তুলনায় বেড়েছে। বিশেষ করে সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন ও সারিগোয়াইন নদীতে উজানের পানির চাপ স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চলে ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ি ঢল নেমে এসে সিলেটের নদীগুলোতে এই চাপ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে রোববার বেলা ৩টায় পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ১১ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার। সেখানে বিপদসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ বিপদসীমা থেকে খুব বেশি দূরে নেই নদীটির পানি। একই সময়ে সুরমা নদীর সিলেট পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৮ দশমিক ০৬ সেন্টিমিটার, যেখানে বিপদসীমা ১২ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার। যদিও এখনো পানি বিপদসীমার নিচে রয়েছে, তবে উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কুশিয়ারা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টেও পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অমলশিদ পয়েন্টে বেলা ৩টায় পানির উচ্চতা ছিল ১১ দশমিক ৮১ সেন্টিমিটার, যেখানে বিপদসীমা ১৫ দশমিক ৪০ সেন্টিমিটার। শেওলা পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৯ দশমিক ৫৮ সেন্টিমিটার, বিপদসীমা ১৩ দশমিক ০৫ সেন্টিমিটার। ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২৭ সেন্টিমিটার, সেখানে বিপদসীমা ১০ দশমিক ৪৫ সেন্টিমিটার। এছাড়া শেরপুর পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৬ দশমিক ৩০ সেন্টিমিটার, বিপদসীমা ৮ দশমিক ৫৫ সেন্টিমিটার।

শুধু সুরমা ও কুশিয়ারা নয়, পাহাড়ি ঢলের প্রভাব পড়েছে পিয়াইন ও সারিগোয়াইন নদীতেও। পিয়াইন নদীর জাফলং পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৭ দশমিক ৩১ সেন্টিমিটার, যেখানে বিপদসীমা ১৩ দশমিক ০০ সেন্টিমিটার। অন্যদিকে সারিগোয়াইন নদীর গোয়াইনঘাট পয়েন্টে পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ০৭ সেন্টিমিটার, বিপদসীমা ১০ দশমিক ৮২ সেন্টিমিটার। যদিও এখনো পানি বিপদসীমার নিচে রয়েছে, তবে নদীগুলোর পানির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস জানিয়েছেন, ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে টানা বৃষ্টির কারণে ঢলের পানি দ্রুত নেমে আসছে। এতে সিলেট অঞ্চলের প্রায় সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, “এই ঢল অব্যাহত থাকলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। ফলে আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এ ধরনের বন্যার পানি সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেটের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই উজানের পাহাড়ি ঢলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে এই অঞ্চলে। ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা পানি খুব দ্রুত সিলেটের নদীগুলোতে প্রবেশ করে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর পানি বেড়ে গিয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার নিচু এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

গত কয়েক বছরে সিলেটে একাধিক ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা মানুষের মনে এখনো তাজা। ২০২২ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় পুরো সিলেট অঞ্চল বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবিক সংকটে পড়েন। রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণে এবারও নদীর পানি বাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেক মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, সামান্য বৃষ্টিতেই এখন অনেক খাল-বিল ও নিম্নাঞ্চলে পানি জমে যাচ্ছে। উজান থেকে আরও পানি এলে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে। বিশেষ করে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। কারণ এ সময় অনেক জমিতে বোরো ধান কাটা শেষ পর্যায়ে থাকে। আকস্মিক বন্যা হলে মাঠের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে বলে জানা গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড নিয়মিত নদীর পানি পরিমাপ করছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষকে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী কয়েকদিন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে উজান থেকে আরও পানি নামার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও সিলেটে এখনো ভারী বর্ষণ শুরু হয়নি, তবুও পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এ কারণে স্থানীয়দের অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক এড়িয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সিলেটের মানুষ প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি নিয়ে জীবনযাপন করেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার আচরণ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো আকস্মিক ঢল—সব মিলিয়ে দুর্যোগের মাত্রা বাড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে নদী ব্যবস্থাপনা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞরা।

এখন সবার দৃষ্টি সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর দিকে। উজানের ঢল যদি আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে সিলেটে আবারও আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাই আতঙ্ক নয়, বরং সতর্কতা ও প্রস্তুতিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

সিলেটসহ আট জেলায় ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৫৯ মামলায় ২৮৪ জন অব্যাহতির পথে

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নবীগঞ্জে শিক্ষিকাদের অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাই

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সৌদিতে আটক হবিগঞ্জের প্রশাসক মুকিব

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হামলার ভয়ে পরিবার নিয়ে বাড়িছাড়া ছালাম

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

সিলেটসহ আট জেলায় ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ৫৯ মামলায় ২৮৪ জন অব্যাহতির পথে

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নবীগঞ্জে শিক্ষিকাদের অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাই

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সৌদিতে আটক হবিগঞ্জের প্রশাসক মুকিব

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হামলার ভয়ে পরিবার নিয়ে বাড়িছাড়া ছালাম

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোমবার সিলেটে টিসিবির পণ্য মিলবে ১০ এলাকায়

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ