প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার একটি বসতঘরের রান্নাঘর থেকে বিষধর গোখরা সাপ উদ্ধার হওয়ায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হঠাৎ রান্নাঘরের ভেতর ফোঁসফোঁস শব্দ শুনে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে একটি ইঁদুরের গর্তে ফণা তুলে থাকা গোখরা সাপ দেখতে পেয়ে পুরো বাড়িতে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে সাপটি উদ্ধার করে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। পরে সাপটি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের জানাউড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা তারেক আহমদের বসতবাড়ির রান্নাঘরে বিষধর সাপটির অবস্থান ধরা পড়ে। ঘটনাটি জানাজানি হলে আশপাশের লোকজনও সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুরের দিকে পরিবারের সদস্যরা রান্নাঘর পরিষ্কার করছিলেন। এসময় হঠাৎ তারা অস্বাভাবিক শব্দ শুনতে পান। প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও পরে শব্দ আরও তীব্র হলে তারা খোঁজ নিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে রান্নাঘরের একটি ইঁদুরের গর্তের কাছে গিয়ে তারা দেখতে পান একটি বড় আকৃতির গোখরা সাপ ফণা তুলে রয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরে।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে স্থানীয়রা জানান, সাপটি দেখতে পাওয়ার পর ঘরের নারীরা চিৎকার শুরু করেন। তাদের চিৎকার শুনে বাড়ির অন্য সদস্য ও প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। কেউ কেউ শুরুতে সাপটিকে মারার চেষ্টা করলেও পরে সাপটির আচরণ দেখে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যান। কারণ গোখরা সাপ সাধারণত অত্যন্ত বিষধর ও আক্রমণাত্মক হিসেবে পরিচিত।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বুঝতে পেরে স্থানীয়রা শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে সংগঠনটির পরিচালক স্বপন দেব সজল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে দীর্ঘ চেষ্টার পর তিনি সাপটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
স্বপন দেব সজল জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনি দেখতে পান রান্নাঘরের একটি গর্তের ভেতর সাপটি অবস্থান করছে। আশপাশে প্রচুর মানুষ জড়ো হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তিনি সবাইকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে সাপটি উদ্ধার করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি বিষধর গোখরা সাপ এবং এ ধরনের সাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্ষাকাল ও গরমের সময় সাপ অনেক সময় খাবার কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। বিশেষ করে ইঁদুরের উপস্থিতি থাকলে গোখরা বা অন্য সাপ ঘরের ভেতর ঢুকে পড়তে পারে। তাই বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং ইঁদুরের উপদ্রব কমানো জরুরি।
সাপটি উদ্ধারের পর সেটি শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়। বন বিভাগ জানিয়েছে, সাপটিকে নিরাপদ পরিবেশে অবমুক্ত করা হবে। পরে জানা যায়, সাপটি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যপ্রাণী হত্যা না করে উদ্ধারকারীদের খবর দেওয়াটা ইতিবাচক দিক। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই আতঙ্কে মানুষ সাপ দেখলেই মেরে ফেলার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাপ প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গোখরা সাপ মূলত ইঁদুর ও ছোট প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। ফলে কৃষিজমি ও গ্রামীণ পরিবেশে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে এদের ভূমিকা রয়েছে। তবে বিষধর হওয়ায় এদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। সাপ দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী বা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় সাপের উপদ্রব কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগে বিভিন্ন ঝোপঝাড় ও বসতঘরের আশপাশে সাপ দেখা যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের দ্রুত পদক্ষেপে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। অনেকে সাপ উদ্ধারের ভিডিও ও ছবি শেয়ার করে সচেতনতার কথা বলছেন। কেউ কেউ বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয় সংগঠনগুলোর ভূমিকার প্রশংসাও করেছেন।
প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বনাঞ্চল কমে যাওয়া, আবাসস্থল ধ্বংস এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণেও অনেক বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে। ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং উদ্ধারকারী দলগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
জানাউড়া গ্রামের ওই পরিবারের সদস্যরা এখনও আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। রান্নাঘরের সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়লে এখনও শিউরে উঠছেন তারা। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই সাপটি উদ্ধার হওয়ায় স্বস্তিও প্রকাশ করেছেন সবাই।
শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান কতটা সংবেদনশীল। আতঙ্ক নয়, সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণই পারে মানুষ এবং বন্যপ্রাণী—উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।


