প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীর লোহারপাড়া এলাকায় এক প্রতিবন্ধী নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৯। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর নগরজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একজন প্রতিবন্ধী নারীকে টার্গেট করে এমন নৃশংস ঘটনার অভিযোগ সমাজের মানবিক মূল্যবোধ ও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
র্যাব জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত পৃথক অভিযান চালিয়ে তিন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন সিলেটের এয়ারপোর্ট থানার মহালদিক এলাকার মৃত আব্দুল হেকিম তসির আলীর ছেলে মো. আতিকুর রহমান জুয়েল (৪০), গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ মুরুয়া দত্ত গ্রামের মৃত ময়েজ উদ্দিনের ছেলে মো. শামসুল হক (৪৫) এবং কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার হুমায়ুনপুর এলাকার মৃত নূর মোহাম্মদ নানু মিয়ার ছেলে মো. হাসান আলী ওরফে আশিক।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, সোমবার শাহজালাল (রহ.) মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সাতক্ষীরা থেকে সিলেটে আসেন ওই প্রতিবন্ধী নারী। তিনি একাই সিলেটে এসেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। মাজার এলাকায় অবস্থানকালে শাহপরাণ মাজার গেইট এলাকায় প্রধান অভিযুক্ত আতিকুর রহমান জুয়েলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে বিয়ের আশ্বাস ও নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাকে নগরীর লোহারপাড়ার একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে রাতভর ওই নারীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। পরদিন সকালে অভিযুক্তরা তাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায়। পরে ভুক্তভোগী স্থানীয় লোকজনের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে।
ঘটনার পর র্যাব-৯ দ্রুত অভিযান শুরু করে। মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে লোহারপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রথমে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিকাল ৫টার দিকে দক্ষিণ সুরমার হুমায়ুন রশীদ চত্বরে অভিযান চালিয়ে অপর অভিযুক্ত হাসান আলী ওরফে আশিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাব-৯ এর গণমাধ্যম কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই র্যাব দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় র্যাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ঘটনার পর স্থানীয় এলাকাতেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, একজন প্রতিবন্ধী নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এমন অপরাধ সংঘটিত হওয়া অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অমানবিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, প্রতিবন্ধী নারী ও শিশুরা সমাজে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে একা চলাফেরা করা নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা এবং সহায়ক পরিবেশ তৈরি জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক সময় অপরাধীরা পরিচয়, সহানুভূতি কিংবা বিয়ের প্রলোভন ব্যবহার করে নারীদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে। তাই অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ ও কোথাও যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একইসঙ্গে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা শুধু আইনগত নয়, এটি সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়েরও প্রতিফলন। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ও অসহায় নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হওয়া জরুরি। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সচেতনতা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী নির্যাতন ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা সামাজিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একের পর এক অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করলেও সমাজে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি পুরোপুরি কাটছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু গ্রেপ্তার নয়, অপরাধ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগও প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী নারীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও চিকিৎসা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে মামলার তদন্তে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
লোহারপাড়ার এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষগুলো কত সহজেই প্রতারণা ও সহিংসতার শিকার হয়ে পড়ছেন। একজন প্রতিবন্ধী নারীকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া এই নির্মম অভিযোগ শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি মানবিকতার ওপরও এক গভীর আঘাত হিসেবে দেখছেন অনেকেই।


