প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে পরিচালিত এই অভিযানের প্রথম দিনেই লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রবিহীন বিপুল সংখ্যক মোটরসাইকেল জব্দ করেছে পুলিশ। সোমবার সকাল থেকে উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার ও ব্যস্ত এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহনের কাগজপত্র যাচাই এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থানে দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
সকাল থেকেই বড়লেখা পৌর শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথে পুলিশের বাড়তি উপস্থিতি চোখে পড়ে। কলেজ রোড, দক্ষিণবাজার, স্টেশন রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক সদস্যরা মোটরসাইকেল থামিয়ে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করেন। এ সময় বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ অনেক চালকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অভিযানের সময় বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল জব্দ করে পিকআপ ভ্যানে তুলে থানায় নিয়ে যেতে দেখা গেছে। অনেক চালক হেলমেট ছাড়া চলাচল করছিলেন, আবার কেউ কেউ ট্রিপল রাইডিং কিংবা উল্টো পথে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। এসব অপরাধে তাৎক্ষণিক জরিমানাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশের উপস্থিতি ও কড়াকড়ির কারণে সড়কে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচলে ধীরগতি দেখা দিলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর বড়লেখার সড়কে এমন কঠোর ট্রাফিক অভিযান দেখা গেল। তাদের মতে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি মোটরসাইকেলের বেপরোয়া চলাচল বেড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেল এবং হেলমেট ছাড়া দ্রুতগতিতে চলাচল সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছিল। ফলে পুলিশের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন অধিকাংশ মানুষ।
দক্ষিণবাজার এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, প্রায় প্রতিদিনই এখানে মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতি দেখা যায়। অনেক সময় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও পথচারীরা আতঙ্কে রাস্তা পার হন। পুলিশের এমন অভিযান নিয়মিত হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড়লেখা উপজেলার সড়কগুলোতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। গ্রাম থেকে শহর, বাজার থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবখানেই এখন মোটরসাইকেল প্রধান যাতায়াতমাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়েনি ট্রাফিক সচেতনতা। অনেক চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই, আবার অনেকেই ট্রাফিক আইন মানতে অনাগ্রহী। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ ওঠে।
ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের এই বিশেষ অভিযান কেবল জরিমানা বা গাড়ি জব্দ করার জন্য নয়; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। পুলিশ বলছে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে চালকদের অবশ্যই বৈধ লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখতে হবে। পাশাপাশি হেলমেট ব্যবহার, নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা এবং ট্রাফিক আইন অনুসরণ করাও বাধ্যতামূলক।
অভিযান চলাকালে অনেক মোটরসাইকেল চালককে কাগজপত্র না থাকার কারণ ব্যাখ্যা করতে দেখা গেছে। কেউ বলেছেন, লাইসেন্সের আবেদন করেছেন কিন্তু এখনও হাতে পাননি। কেউ আবার দাবি করেছেন, হঠাৎ অভিযানের কারণে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে আনতে পারেননি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, আইন অমান্যের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
বড়লেখা থানার একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ এলাকা ও বাজারকেন্দ্রিক সড়কগুলোতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে অনেক অভিভাবকও পুলিশের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অজান্তেই তারা দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। পুলিশের কঠোর নজরদারি থাকলে এমন প্রবণতা কমবে বলে তারা আশা করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান চালালেই হবে না, এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জরুরি। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। তারা মনে করেন, আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে সাধারণ মানুষও ধীরে ধীরে নিয়ম মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন।
বাংলাদেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে হেলমেট ব্যবহার না করা, অতিরিক্ত গতি এবং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোকে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ অবস্থায় বড়লেখায় পুলিশের সাম্প্রতিক এই উদ্যোগকে সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অভিযানের সময় সড়কে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল দেখা যায়। অনেকে দাঁড়িয়ে পুলিশের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, এমন অভিযান যদি নিয়মিত হয়, তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা অনেকটাই ফিরে আসবে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযান কেবল বড়লেখা পৌর শহরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন সড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ বাজার এলাকাতেও পর্যায়ক্রমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে অবৈধ যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভিং এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। কারণ আইন মানার সংস্কৃতি তৈরি না হলে কেবল অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া কঠিন। তবুও বড়লেখার সাম্প্রতিক এই অভিযান স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে ট্রাফিক সচেতনতার আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


