প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে চার বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার হত্যার ঘটনায় এলাকায় শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিষ্পাপ এই শিশুকে হত্যার অভিযোগে জাকির হোসেন নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযুক্ত জাকির নিহত শিশুর প্রতিবেশী এবং সম্পর্কে তার চাচা বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। সোমবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করার পর উত্তেজিত এলাকাবাসী জালালাবাদ থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন এবং পরে অভিযুক্তের বাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত ফাহিমা আক্তার সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের মেয়ে। পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র। রাইসুল হক স্থানীয় একটি বাজারে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে সংসার চালান। গ্রামের সবার কাছে হাসিখুশি ও চঞ্চল শিশু হিসেবে পরিচিত ছিল ফাহিমা। কিন্তু সেই শিশুর নির্মম মৃত্যু পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ফাহিমা বাড়ির আশপাশে খেলছিল। একপর্যায়ে সে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে এলাকায় মাইকিং করা হয় এবং গ্রামবাসীও অনুসন্ধানে অংশ নেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পরও শিশুটির কোনো সন্ধান না মেলায় পরিবারের উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
পরবর্তীতে গ্রামের একটি ডোবা থেকে ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক তদন্ত এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহের তীর যায় প্রতিবেশী জাকির হোসেনের দিকে। পরে সোমবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করে জালালাবাদ থানা পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, জাকির শিশুটিকে নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তাকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। এরপর মরদেহ গোপন করার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাকালে জাকিরের বাড়িতে পরিবারের অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন না। অভিযোগ উঠেছে, পরে মরদেহ একটি ব্যাগে ভরে বাড়ির পাশের ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।
তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের স্বার্থে ঘটনার বিস্তারিত সব তথ্য প্রকাশ করেনি। জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামসুল হাবিব গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অভিযুক্তকে থানাহাজতে রাখা হয়েছে এবং ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
জাকির গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাতেই শত শত মানুষ জালালাবাদ থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা এখন ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর একটি অংশ মধ্যরাতে জাকিরের বাড়িতে হামলা চালায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি রাখা হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে ফাহিমার পরিবারের কান্না আর আহাজারিতে পুরো এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে। শিশুটির মা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। প্রতিবেশীরা বলছেন, মাত্র কয়েকদিন আগেও গ্রামের উঠোনে খেলাধুলা করা সেই শিশুর এমন নির্মম পরিণতি কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনাকে ঘিরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, পরিবার ও সমাজে শিশুদের প্রতি নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, দেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে পরিচিতজন বা আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের সংখ্যা বাড়ায় পরিবারগুলোও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তারা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের নিরাপত্তা শিক্ষা এবং মানসিক বিকারগ্রস্ত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুরা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কতক্ষণ বাইরে থাকছে—এসব বিষয়ে পরিবারকে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিশুদেরও “নিরাপদ ও অনিরাপদ আচরণ” সম্পর্কে বয়স উপযোগী শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা।
সিলেটের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু পারিবারিক নয়, সামাজিক দায়িত্বও। একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণহানির ঘটনায় পুরো সমাজ যখন শোকাহত, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।


