প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার বার্তা ছড়িয়ে অনূর্ধ্ব-১৪ ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছে জৈন্তাপুর উপজেলা ফুটবল একাদশ। টানটান উত্তেজনায় ভরা ফাইনাল ম্যাচে শক্তিশালী গোলাপগঞ্জ উপজেলাকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করে জৈন্তাপুরের কিশোর ফুটবলাররা। এই জয়ের মধ্য দিয়ে শুধু একটি ট্রফিই নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় ফুটবল প্রজন্ম হিসেবে নিজেদের সামর্থ্যেরও জানান দিয়েছে দলটি।
শনিবার বিকেল ৪টায় সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। গ্যালারিজুড়ে উপস্থিত দর্শক, অভিভাবক ও ক্রীড়াপ্রেমীদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। দুই উপজেলার সমর্থকদের উপস্থিতিতে ম্যাচটি যেন এক ক্ষুদে ফুটবল যুদ্ধের রূপ নেয়। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে দুই দল। তবে ম্যাচের ১৪তম মিনিটেই জৈন্তাপুরের আক্রমণভাগের খেলোয়াড় আশফাক দুর্দান্ত এক গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেদ করে নেওয়া সেই গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
গোল হজমের পর গোলাপগঞ্জ উপজেলা দল একাধিক আক্রমণ চালালেও জৈন্তাপুরের রক্ষণভাগ ছিল অত্যন্ত সংগঠিত ও দৃঢ়। গোলরক্ষকের কয়েকটি চমৎকার সেভ এবং ডিফেন্ডারদের আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্সে গোলাপগঞ্জ আর সমতায় ফিরতে পারেনি। ফলে নির্ধারিত ৫০ মিনিটের খেলা শেষে ১-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে জৈন্তাপুর উপজেলা দল।
ফাইনাল ম্যাচের আগে শুক্রবার অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালেও দারুণ ফুটবল উপহার দেয় জৈন্তাপুর। কম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে ২-০ গোলে পরাজিত করে ফাইনালে জায়গা করে নেয় তারা। দলের ম্যানেজার শাহীন আলম জানান, পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে খেলোয়াড়রা শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছে। প্রতিটি খেলোয়াড় জয়ের জন্য সর্বোচ্চ পরিশ্রম করেছে বলেই এই সাফল্য এসেছে।
খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক জৈন্তা বার্তা পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ও সিলেট জেলা দলের সাবেক ফুটবলার রেজাউল করিম নাচন। তিনি বিজয়ী খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, জৈন্তাপুরের কিশোর ফুটবলাররা অত্যন্ত দক্ষতা ও পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের খেলায় আত্মবিশ্বাস, গতি এবং দলীয় সমন্বয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, সঠিক প্রশিক্ষণ, পরিচর্যা ও সুযোগ পেলে এই খেলোয়াড়দের অনেকেই ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ৪নং দরবস্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাহারুল আলম বাহার, সিলেট জেলা তাঁতিদলের সদস্য সচিব আলতাফ হোসেন বেলাল, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সুজন এবং ৩নং চারিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাহআলম চৌধুরী তোফায়েল। তারা সবাই কিশোর খেলোয়াড়দের এই অর্জনের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করার আশ্বাস দেন।
ফাইনাল শেষে জৈন্তাপুর উপজেলা দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস আর আবেগের মিশেল। কেউ ট্রফি হাতে ছবি তুলেছেন, কেউ সতীর্থদের জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অভিভাবকদের চোখেও ছিল গর্বের ঝিলিক। তাদের অনেকেই বলছিলেন, মোবাইল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তির এই সময়ে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এমন আয়োজন তরুণদের সুস্থ বিনোদন ও সুন্দর ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দলের ম্যানেজার শাহীন আলম জানান, জৈন্তাপুর উপজেলা দল থেকে ছয়জন খেলোয়াড় চূড়ান্তভাবে সিলেট জেলা একাদশে জায়গা পেয়েছে। তারা পরবর্তীতে বিভাগীয় পর্যায়ে সিলেট জেলার প্রতিনিধিত্ব করবে। এই অর্জনকে তিনি জৈন্তাপুরের ফুটবলের জন্য বড় প্রাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রত্যন্ত এলাকার এই ছেলেরা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা।
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের মতে, জৈন্তাপুরে দীর্ঘদিন ধরেই ফুটবলের প্রতি তরুণদের আগ্রহ রয়েছে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষণের অভাব এবং পর্যাপ্ত টুর্নামেন্ট না থাকায় অনেক প্রতিভা হারিয়ে যায়। নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মতো প্রতিযোগিতা তরুণদের নিজেদের তুলে ধরার একটি বড় মঞ্চ তৈরি করেছে। এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে অনেক নতুন প্রতিভা উঠে এসেছে, যারা ভবিষ্যতে দেশের ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
সিলেটের ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ফুটবলের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে তৃণমূল পর্যায় থেকেই প্রতিভা খুঁজে বের করতে হবে। স্কুল, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত রাখতে হবে। কারণ একটি ভালো খেলোয়াড় শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো অঞ্চলের গর্ব হয়ে উঠতে পারে।
“ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত টুর্নামেন্টটির মূল লক্ষ্যও ছিল কিশোরদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করা এবং মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখা। আয়োজকদের মতে, খেলাধুলা শুধু শারীরিক সুস্থতা নয়, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জৈন্তাপুর উপজেলার এই সাফল্যে এখন পুরো এলাকায় আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অভিনন্দনের জোয়ার বইছে। স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরা আশা করছেন, এই জয়ের মধ্য দিয়ে জৈন্তাপুরে ফুটবলের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো।


