প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবার বোরো ধান ঘরে তোলার মৌসুম যেন কৃষকদের জন্য আশার বদলে উদ্বেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বছরের শুরু থেকেই বৈরি আবহাওয়া, অতিবৃষ্টি, শ্রমিক সংকট এবং জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সংকট কৃষকের উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ বাজারে ধানের দাম প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। ফলে মাঠে সোনালি ধান থাকলেও কৃষকের চোখে এখন আনন্দের বদলে অনিশ্চয়তা আর হতাশার ছাপ স্পষ্ট।
সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর এলাকা ঘুরে এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের বোরো মৌসুমে চাষাবাদের শুরু থেকেই নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। ফাল্গুন মাস থেকেই অনিয়মিত বৃষ্টি শুরু হয়। পরে চৈত্র ও বৈশাখজুড়ে দফায় দফায় ঝড়-বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি এবং বজ্রপাত কৃষকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দেয়। এরই মধ্যে গত এক সপ্তাহ ধরে সিলেট বিভাগে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে। এতে অনেক নিচু জমি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং কাটা ধান শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হাওরের কৃষকদের ভাষায়, একসময় ধান কাটার মৌসুম ছিল উৎসবের মতো। কিন্তু এখন তা হয়ে উঠেছে টিকে থাকার লড়াই। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাউসী গ্রামের প্রান্তিক কৃষক প্রসন্ন কুমার বলেন, এবছর ধান ঘরে তুলতে গিয়ে তাদের “ডাবল খরচ” গুনতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে মাঠে পানি জমে থাকায় শ্রমিকের কাজের গতি কমে গেছে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং খলায় ধান শুকানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, শত শত মণ ধান রোদ না থাকায় নষ্ট হওয়ার পথে। অথচ বাজারে ধানের দাম এত কম যে খরচই উঠবে না।
একই উপজেলার কৃষক আব্দুল কাইয়ুমের কণ্ঠেও ছিল ক্ষোভ ও হতাশা। তিনি জানান, বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ ধান ৮০০ টাকার মতো দামে কিনছে মিল মালিকেরা। কিন্তু একজন শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। শুধু ধান কাটাই নয়, কাদা ও পানিতে ভরা মাঠ থেকে ধান গোলায় তুলতে অতিরিক্ত শ্রমিক লাগছে। তিনি বলেন, প্রতি কের জমিতে সর্বোচ্চ ২০ মণ ধান হতে পারে। সেই ধানের দাম দিয়ে খরচ মেটানোই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অনেক কৃষককে জমি বা বাড়িঘর বিক্রি করতে হতে পারে।
সিলেট সদর সংলগ্ন নালিয়ার কৃষক শামসুল আলম জানান, টানা বৃষ্টির কারণে ধান ঠিকভাবে পাকছে না। মাঝেমধ্যে রোদ না উঠলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তিনি বলেন, ধান পাকার সময় অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে ফলন ও গুণগত মান দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব বাজারমূল্যেও পড়ে।
কৃষকদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের সংকট এবারের মৌসুমে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে। ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন, মাড়াই যন্ত্র এবং পরিবহন যানবাহনের প্রায় সবই ডিজেলচালিত। কিন্তু হাওরাঞ্চলে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তা কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। এতে যান্ত্রিক কৃষিকাজের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
হাওরাঞ্চলের অনেক কৃষক জানান, শ্রমিকের অভাবও এবার প্রকট আকার ধারণ করেছে। বজ্রপাত ও ঝড়ের কারণে অনেক শ্রমিক হাওরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে বজ্রপাতে কয়েকজন কৃষকের মৃত্যুর ঘটনা শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ফলে শ্রমিকের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ কমে গেছে। এই সুযোগে মজুরিও বেড়েছে কয়েকগুণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওর অঞ্চলে কৃষকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাজারব্যবস্থা। সরকার প্রতিবছর ধান ও চাল সংগ্রহ কর্মসূচি চালু করলেও সরাসরি ক্ষুদ্র কৃষকরা তার সুফল খুব কম পান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী, মিল মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরাই লাভবান হন।
‘হাওর নদী পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন’-এর প্রচার সম্পাদক মো. মেকদাদ বলেন, এবছর উৎপাদন খরচ এত বেড়েছে যে অধিকাংশ কৃষক লোকসানের মুখে পড়বেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ধানের চেয়ে চাল বেশি কেনে। ফলে কৃষকরা সরাসরি ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে পারেন না। মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীরা কম দামে ধান কিনে লাভবান হলেও প্রকৃত উৎপাদক কৃষক বঞ্চিত হন।
এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও ধান উৎপাদন পুরোপুরি ব্যাহত হয়নি। সিলেট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শামসুজ্জামান জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত জেলার প্রায় ৫৮ শতাংশ বোরো ধান কাটা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে বাকি ধানও কেটে ফেলা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি। তিনি আরও জানান, সরকারের নির্ধারিত ধানের দর প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা। তবে সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হলে কৃষকরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।
তবে কৃষকদের অনেকেই বলছেন, সরকারি দর কাগজে থাকলেও বাস্তবে তারা সেই দামে ধান বিক্রি করতে পারেন না। কারণ সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে নানা প্রক্রিয়া, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যয় রয়েছে। ফলে স্থানীয় বাজারেই কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা।
অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় হাওরাঞ্চলের কৃষকদের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজারমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে কৃষকেরা ধীরে ধীরে কৃষিকাজে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু সাময়িক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান কেনার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে হাওরাঞ্চলে আধুনিক সংরক্ষণ ও শুকানোর ব্যবস্থা গড়ে তুললে অতিবৃষ্টি ও বৈরি আবহাওয়ার ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
হাওরের বিস্তীর্ণ মাঠে এখনো দুলছে পাকা ধান। কিন্তু সেই সোনালি শস্য ঘিরে কৃষকের মুখে হাসি নেই। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পরও যদি ন্যায্যমূল্য না মেলে, তাহলে কৃষকের স্বপ্নও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের কৃষকেরা এখন সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই সময় পার করছেন।


