প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগজুড়ে আগামী কয়েক দিনে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। বজ্রমেঘের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় সিলেটসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে দফায় দফায় বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে আগামী ১৩ মে সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা থাকায় স্থানীয় প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সিলেট অঞ্চলের আকাশে বজ্রমেঘ সৃষ্টি এবং এর বিস্তৃতি অব্যাহত থাকতে পারে। এর প্রভাবে আগামী কয়েক দিন ধরে মাঝারি থেকে ভারী এবং কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত ওই সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়, সিলেট বিভাগের কিছু এলাকায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত এবং কোথাও কোথাও ৮৮ মিলিমিটারের বেশি অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাব ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠছে এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট জলীয়বাষ্প দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মেঘের ঘনত্ব বাড়াচ্ছে। এর ফলে সিলেট অঞ্চলে বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেট ভৌগোলিকভাবেই দেশের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা হওয়ায় অতিরিক্ত বর্ষণে দ্রুত জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ইতোমধ্যে সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। নগরবাসীর অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জলাবদ্ধতা, সড়কে পানি জমে থাকা এবং চলাচলে ভোগান্তির আশঙ্কার কথা তুলে ধরছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেও নগরীর কিছু এলাকায় পানি জমে যায়। ফলে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সিলেট বিভাগের নিচু এলাকা ও হাওর অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ গত কয়েক বছরে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এই অঞ্চলে একাধিকবার ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও এবার এখনো বন্যার কোনো আনুষ্ঠানিক পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি, তবুও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এপ্রিলের শেষ দিক থেকে মে মাসজুড়ে দেশে কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত এবং ভারী বর্ষণের প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার আচরণ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কখনো স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আবার কখনো দীর্ঘ সময় খরার মতো পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে। সিলেট অঞ্চলে এই পরিবর্তনের প্রভাব তুলনামূলক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, বজ্রমেঘের সক্রিয়তার কারণে দফায় দফায় বৃষ্টি এবং বজ্রপাত হতে পারে। এ অবস্থায় নদীপথে চলাচলকারী নৌযানগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে খোলা স্থানে অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারী বর্ষণের সময় শহরাঞ্চলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় জলাবদ্ধতা। ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং খাল-নালা দখলের কারণে অনেক এলাকায় পানি দ্রুত নামতে পারে না। ফলে স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতেও নগরজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। সিলেট নগরীর বাসিন্দারা বলছেন, বৃষ্টি শুরু হলেই অনেক সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে যায়, যা শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী এবং ব্যবসায়ীদের জন্য দুর্ভোগ তৈরি করে।
অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় কৃষকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বোরো ধান কাটার মৌসুম প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও কিছু এলাকায় এখনও ধান ক্ষেতে রয়েছে। টানা ভারী বর্ষণ হলে কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া অতিরিক্ত বৃষ্টিতে মাছের ঘের, সবজি ক্ষেত এবং গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সিলেটের কয়েকজন পরিবহন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, অতিবৃষ্টি হলে মহাসড়ক এবং অভ্যন্তরীণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকার সড়কগুলোতে ভূমিধসের ঝুঁকিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যদিও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়নি, তবে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর সাধারণ মানুষকে আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনও বিভিন্ন উপজেলায় প্রস্তুতি গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আবহাওয়ার এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। শুধু তাৎক্ষণিক সতর্কতা নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরবর্তী বুলেটিনের দিকে নজর রাখছেন সিলেটবাসী। টানা বর্ষণের সম্ভাবনায় নগর ও গ্রাম—উভয় অঞ্চলের মানুষ এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। অনেকে প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, ওষুধ ও জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারগুলো বাড়তি সচেতনতা অবলম্বন করছে।
প্রকৃতির অনিশ্চিত আচরণের মধ্যেও মানুষের প্রত্যাশা একটাই—বৃষ্টি যেন আশীর্বাদ হয়ে আসে, দুর্ভোগ হয়ে নয়। তবে আবহাওয়া বিভাগের সতর্কবার্তা বলছে, আগামী কয়েক দিন সিলেটবাসীকে বাড়তি সতর্কতা নিয়েই চলতে হবে।


