প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজার জেলায় হাম উপসর্গে তিন শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। গত তিন সপ্তাহে জেলার শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলায় পৃথক সময়ে এই তিন শিশুর মৃত্যু হয়। মৃত শিশুদের মধ্যে একজনের বয়স ছিল এক বছর পাঁচ মাস এবং বাকি দুজনের বয়স ছিল মাত্র নয় মাস। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ঘটনাগুলোকে “হাম উপসর্গজনিত মৃত্যু” হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় হাম আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগ বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ৪২৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের ধারণা, পরীক্ষার ফলাফল হাতে এলে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে।
জেলা ইপিআই সুপারভাইজার মো. আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, জেলার প্রতিটি উপজেলায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে এবং হাম প্রতিরোধে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “সব উপজেলায় হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। সারা জেলা থেকে ৪২৪ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর বোঝা যাবে কতজন আক্রান্ত হয়েছেন এবং কতজন নিরাপদ আছেন।”
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, মৃত তিন শিশুর মধ্যে শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়ার দুই শিশুর পরিবার বর্তমানে সিলেটে বসবাস করলেও তাদের স্থায়ী ঠিকানা মৌলভীবাজার হওয়ায় জেলার পরিসংখ্যানে এই মৃত্যুগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ কারণে জেলার সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মূল্যায়নে ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক সপ্তাহ ধরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, সর্দি-কাশি এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে শিশুদের হাসপাতালে নেওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় সচেতনতার অভাব ও সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে অনেক পরিবার আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানিয়েছেন, জেলায় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৯৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। তারপরও কিছু শিশু টিকার বাইরে থেকে যাওয়ায় ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, “আমরা প্রতিটি এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। যেসব পরিবার এখনও শিশুদের নিয়মিত টিকা দেয়নি, তাদের দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।”
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম সাধারণত শিশুদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অপুষ্টি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা কিংবা টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতা মারাত্মক হতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট এমনকি মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক আবহাওয়া পরিবর্তন, কিছু এলাকায় টিকাদানে অনীহা এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে সংক্রমণ বাড়তে পারে।
মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার বিষয়ও তুলে ধরছেন। বিশেষ করে গ্রামের দিকে দ্রুত চিকিৎসা ও পরীক্ষার সুবিধা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন অনেক অভিভাবক।
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিশেষ টিম গঠন করেছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অতিরিক্ত নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে জ্বর বা ফুসকুড়ির উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তবে যেকোনো সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সামান্য অবহেলাও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু দেশে হাম সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা মহামারির সময় অনেক দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় শিশুদের মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখলেও কিছু এলাকায় সচেতনতার অভাব এখনও চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
মৌলভীবাজারের সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য বিভাগ এখন বাড়তি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জেলার হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে গুজব বা ভুল তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, আতঙ্ক নয় বরং সচেতনতাই হতে পারে পরিস্থিতি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে বড় ধরনের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।


