প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট সিটি করপোরেশন পরিচালিত আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রকল্পের আওতাধীন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় চাকরি হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন শতাধিক স্বাস্থ্যকর্মী। দীর্ঘদিন ধরে নগর এলাকার দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসা এসব কর্মী কয়েক মাস ধরে বেতন-ভাতা না পেলেও মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মঙ্গলবার সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত আরবান হেলথ কেয়ার কেন্দ্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে নগরবাসীর জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম নির্ভরতার জায়গা হিসেবে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য এসব কেন্দ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০০৭ সাল থেকে এই প্রকল্পের মাধ্যমে নগর মাতৃসদন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বিভিন্ন প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি বড় হাসপাতালগুলোর অতিরিক্ত চাপ কমাতেও এসব কেন্দ্র কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
তবে সম্প্রতি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কেন্দ্রগুলো হস্তান্তরের উদ্যোগের কারণে কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কর্মরত ১১৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষ থেকে দেওয়া স্মারকলিপিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে তারা নিষ্ঠার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে এলেও বর্তমানে তাদের চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কয়েক মাস ধরে বেতন-ভাতা বকেয়া থাকলেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত না করতে তারা দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়, নগর এলাকার অসংখ্য দরিদ্র মানুষ এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকেন। মাতৃসেবা, প্রসূতি সেবা, ডেলিভারি, টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ রোগের চিকিৎসাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবি, এই সেবা কার্যক্রম বন্ধ হলে নগরবাসীর একটি বড় অংশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মঙ্গলবার দুপুরে সিসিক প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে কর্মীদের প্রতিনিধিরা স্মারকলিপি হস্তান্তর করেন। এ সময় তারা অনুরোধ জানান, বিদ্যমান জনবলকে সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম যেন অব্যাহত রাখা হয় এবং কর্মরতদের চাকরি সুরক্ষার বিষয়টি যেন সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরা হয়। কর্মীদের ভাষ্য, তারা কেবল নিজেদের কর্মসংস্থানের জন্য নয়, বরং নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেও এই উদ্যোগ নিয়েছেন।
স্মারকলিপি গ্রহণের পর সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী স্বাস্থ্যকর্মীদের আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, আরবান হেলথ কার্যক্রম নগরবাসীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি কোনোভাবেই বন্ধ হবে না। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেবার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। একই সঙ্গে কর্মীদের চাকরি নিয়েও আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে তিনি জানান।
প্রশাসক বলেন, সরকার এবং সিটি করপোরেশন সবসময় জনসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল। স্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘদিনের অবদান মূল্যায়ন করা হবে এবং তাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্বশীলতার প্রশংসা করে বলেন, কয়েক মাস বেতন বন্ধ থাকার পরও তারা যেভাবে মানুষের পাশে থেকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিচালিত আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে এসব কেন্দ্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ প্রক্রিয়ায় কোথাও কোথাও জনবল সমন্বয়, চাকরির ধরন ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগর এলাকায় নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আরবান হেলথ কেয়ার কেন্দ্রগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় এসব কেন্দ্র কার্যকর অবদান রাখছে। তাই প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে যেন সেবা ব্যাহত না হয় এবং কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যায়, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে এখনও কিছুটা শঙ্কা থাকলেও প্রশাসকের আশ্বাসে তারা সাময়িক স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যাতে বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং চাকরি স্থায়িত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তারা আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মানবিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
নগরবাসীর একাংশও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো চালু রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, সিলেট নগরীর বহু নিম্নআয়ের পরিবার নিয়মিত এসব কেন্দ্র থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে থাকে। বিশেষ করে নারীদের মাতৃসেবা ও শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমে এসব কেন্দ্রের অবদান উল্লেখযোগ্য। ফলে কেন্দ্রগুলো কার্যক্রম চালু থাকাটা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সবমিলিয়ে, সিলেট সিটি করপোরেশন পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাস নতুন করে স্বস্তি তৈরি করেছে। এখন সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি থাকবে সরকারের পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার দিকে। নগরবাসীও প্রত্যাশা করছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত হবে না এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


