প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, তিনি নিজেও একজন “অরিজিনাল জাত কৃষক”। কৃষকদের ধান কাটতে দেখে নিজের কৃষিজীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রয়োজনে ক্ষেতে নেমে ধান কাটতেও তিনি পিছিয়ে থাকবেন না। মঙ্গলবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
কৃষিমন্ত্রীর এই মন্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিতদের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করে। অনেকেই তার বক্তব্যকে কৃষকের প্রতি সংহতি ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা যখন বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ফসলহানির শঙ্কায় কঠিন সময় পার করছেন, তখন মন্ত্রীর এমন বক্তব্য স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
সভায় কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হলে কৃষকের অর্থনীতি শক্তিশালী করা জরুরি। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, এই দেশের কৃষকের অর্থনীতি শক্তিশালী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। তাই সরকার কৃষকদের জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা করবে।”
সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকার রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা পক্ষপাত যেন না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, হাওরাঞ্চলের কৃষকরা দেশের খাদ্য উৎপাদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বছরের এক মৌসুমের ফসলের ওপর তাদের পুরো জীবিকা নির্ভর করে। তাই হাওরের কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
তিনি আরও বলেন, আগাম বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় হাওরাঞ্চলে আগাম ধান চাষের বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও উন্নত বীজ ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, কৃষকদের সমস্যা শুধু কাগজে-কলমে দেখলে হবে না, মাঠপর্যায়ে গিয়ে বাস্তবতা বুঝতে হবে। তিনি বলেন, কৃষকের মুখে হাসি থাকলে দেশ এগিয়ে যাবে। কারণ কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
সাম্প্রতিক সময়ে হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে পাকা ও আধাপাকা ধান কাটতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। কোথাও কোথাও পানি ঢুকে ফসলের ক্ষতিও হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের হাওর পরিদর্শন এবং কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়) রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন। তারা হাওরাঞ্চলের চলমান পরিস্থিতি, কৃষকদের সমস্যা এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সরকারের সহায়তা ও আশ্বাসকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে অনেকেই বলছেন, শুধু আশ্বাস নয়, মাঠপর্যায়ে দ্রুত কার্যকর সহায়তা প্রয়োজন। কারণ আকস্মিক বৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধির কারণে অনেকে ধান ঘরে তুলতে না পেরে আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওরাঞ্চলের কৃষি এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি ও পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কৃষকদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, টেকসই কৃষি পরিকল্পনা ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরাঞ্চলে আগাম ধান চাষ, উন্নত জাতের বীজ, দ্রুত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি উপকরণ ও পুনর্বাসন সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ।
সুনামগঞ্জের স্থানীয়দের মতে, কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যে কৃষকদের প্রতি আন্তরিকতার প্রকাশ থাকলেও এখন প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ। কারণ হাওরের মানুষ প্রতিবছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করেন। তাদের জন্য স্থায়ী সমাধানই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
সবমিলিয়ে, কৃষিমন্ত্রীর “আমি অরিজিনাল জাত কৃষক” মন্তব্যটি রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে হাওরের কৃষকদের সংগ্রামী জীবনের সঙ্গে এক ধরনের আবেগী সংযোগ তৈরি করেছে। এখন কৃষকদের দৃষ্টি সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো যায়, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

