প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রাকৃতিক টিলাভূমি, পাহাড়ি ছড়া ও নদীসংলগ্ন এলাকা কেটে অবাধে মাটি ও সিলিকা বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে পরিবেশবিধ্বংসী এই কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না প্রশাসন। ফলে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য, অন্যদিকে ঝুঁকির মুখে পড়ছে সড়ক, সেতু, কৃষিজমি এবং আশপাশের বসতি।
স্থানীয় সূত্র ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের ছয়ঘড়ি এলাকায় প্রাকৃতিক টিলার লাল মাটি কেটে সমতল করা হচ্ছে। ভেকু মেশিন ব্যবহার করে দিনের আলোতেই টিলার মাটি কেটে ট্রাকযোগে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দীর্ঘদিন ধরে টিলা কেটে বিক্রির ফলে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।
একসময় সবুজে ঘেরা টিলাভূমির জন্য পরিচিত এলাকাগুলো এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে বিরানভূমিতে। স্থানীয়দের ভাষ্য, টিলা কাটা শুধু মাটি সরিয়ে নেওয়ার বিষয় নয়; এর মাধ্যমে ধ্বংস হচ্ছে গাছপালা, ছোট ছোট ঝিরি ও পাহাড়ি পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথও। এতে জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অন্যদিকে আলীনগর ইউনিয়নের সুনছড়া চা বাগান এলাকাও এখন পরিবেশ ধ্বংসের আরেক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত হলেও সেখানে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ছড়ার বাঁধ কেটে সিলিকা বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, অসাধু একটি চক্র প্রশাসনের চোখের সামনেই ট্রাক, পিকআপ ও ট্রলিযোগে প্রতিদিন সিলিকা বালু পরিবহন করছে। এতে ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং আশপাশের ভূমি ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
শমশেরনগরের সমাজকর্মী এনামুল হক শামীম জানান, স্থানীয় মানুষ বারবার প্রতিবাদ করলেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না। তিনি বলেন, গত ২৩ এপ্রিল রাতে সুনছড়া এলাকা থেকে অবৈধভাবে সিলিকা বালু বহনকারী একটি ট্রাক স্থানীয় জনতা আটক করে শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়িতে দেয়। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলেও পরবর্তী সময়ে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এলাকাবাসীর মতে, প্রশাসনের নীরবতা ও দুর্বল নজরদারির সুযোগে পরিবেশ ধ্বংসকারী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাদের অভিযোগ, মাঝে মধ্যে স্থানীয় সচেতন মানুষ অবৈধ বালুবাহী যানবাহন আটক করলেও আইনি ব্যবস্থা বা নিয়মিত অভিযান না থাকায় অবৈধ উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না।
এদিকে উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর এলাকায় ধলাই নদীর ওপর নির্মিত একটি স্টিল ব্রিজের নিচ থেকেও অবাধে পলি মাটি উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ব্রিজের নিচ ও নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে মাটি কেটে ট্রাকে করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে ব্রিজের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নদীর তীর ও সেতুর নিচ থেকে এভাবে মাটি কাটা চলতে থাকলে বর্ষাকালে সেতুটি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত হয়ে আশপাশের কৃষিজমি ও বসতবাড়িতেও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কলেজ শিক্ষক জমশেদ আলী বলেন, কমলগঞ্জের টিলাভূমি ও পাহাড়ি ছড়াগুলো শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এগুলো এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বিচারে টিলা কাটা ও বালু উত্তোলনের কারণে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
পেশাজীবী সোলেমান মিয়া বলেন, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে অবৈধ ব্যবসায়ীরা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় মানুষের অভিযোগ ও প্রতিবাদ অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। ফলে সাধারণ মানুষ হতাশ হয়ে পড়ছেন।
চা শ্রমিক নেতা সীতারাম বীন বলেন, পাহাড়ি ছড়া ও টিলা ধ্বংসের প্রভাব চা বাগান এলাকাতেও পড়ছে। বৃষ্টির সময় মাটি ধসে পড়া, পানি জমে থাকা এবং পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে স্থানীয় শ্রমিকদের জীবন-জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, টিলাভূমি ও পাহাড়ি ছড়া প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করে। এগুলো বৃষ্টির পানি ধারণ করে ভূমিক্ষয় রোধে সহায়তা করে। এছাড়া এসব এলাকা জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিকল্পনাহীনভাবে মাটি ও বালু উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া টিলা কাটা ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো কমলগঞ্জেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার, নিয়মিত অভিযান এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান করা কঠিন হবে।
এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ইসলামপুর ইউনিয়নে টিলা কাটার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। এছাড়া বিষ্ণুপুর এলাকায় ব্রিজের নিচ থেকে মাটি কাটা এবং সুনছড়া এলাকায় সিলিকা বালু উত্তোলনের অভিযোগও তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও প্রয়োজন। কেউ অবৈধভাবে টিলা কাটা বা বালু উত্তোলনের তথ্য পেলে প্রশাসনকে জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
সবমিলিয়ে, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ কমলগঞ্জে অবাধে টিলা কাটা ও সিলিকা বালু উত্তোলনের ঘটনায় পরিবেশ সচেতন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


