জগন্নাথপুরে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটতে গিয়ে কৃষকের মৃত্যু

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে অকাল বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া বোরো ধান রক্ষার শেষ চেষ্টা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ছুয়াব আলী (৫৫) নামে এক কৃষক। সোমবার বিকেলে জগন্নাথপুর পৌর এলাকার হবিবপুর গ্রামে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনা এলাকায় গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন দিশেহারা স্বজনরা। স্থানীয় কৃষকরাও বলছেন, বন্যা, ঋণ আর ফসলহানির চাপে এমনিতেই বিপর্যস্ত হাওরাঞ্চলের মানুষ; তার মধ্যে এই মৃত্যু যেন নতুন করে হতাশা আর বেদনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এতে অনেক নিচু এলাকার বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। বছরের একমাত্র বড় ফসল বাঁচাতে কৃষকরা দিন-রাত হাওরে নেমে ধান কাটার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ছুয়াব আলীও নিজের জমির ধান রক্ষা করতে সোমবার সকালে হাওরে যান। কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ধান কাটার কাজ করছিলেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, বিকেলের দিকে হঠাৎ তিনি অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ধানক্ষেতের মধ্যেই পড়ে যান তিনি। সঙ্গে থাকা অন্য কৃষকরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম ও মানসিক চাপের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ছুয়াব আলী অত্যন্ত পরিশ্রমী কৃষক ছিলেন। নিজের জমির ধান বাঁচানোর জন্য তিনি অনেক কষ্ট করছিলেন। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটতে গিয়ে এমন মৃত্যু খুবই দুঃখজনক। পরিবারটি এখন বড় সংকটে পড়ে গেল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ছুয়াব আলীর পরিবার পুরোপুরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবছরের মতো এবারও বোরো মৌসুম ঘিরে তাদের অনেক আশা ছিল। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় সেই স্বপ্ন ভেঙে পড়ে। ফসল হারানোর শঙ্কার মধ্যেও শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি ধান কাটতে নেমেছিলেন। কিন্তু সেই চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের সমাপ্তি ডেকে আনে।

হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বোরো ধানই বছরের প্রধান ফসল। এই ফসলের ওপর নির্ভর করেই পুরো বছরের সংসার চালান অধিকাংশ কৃষক। বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিক খরচ মেটাতে অনেকে ঋণ নেন। ফলে ফসল নষ্ট হলে তাদের ওপর নেমে আসে চরম আর্থিক সংকট। এ বছরও অনেক কৃষক আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও পাহাড়ি ঢল—এসব কারণে কৃষকদের ফসল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বোরো ধান কাটার মৌসুমে আকস্মিক পানি বৃদ্ধি কৃষকদের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় ফসল রক্ষার তাড়নায় কৃষকরা নিজের শারীরিক সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে কাজ করেন, যা স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করে।

জগন্নাথপুর উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, চলতি মৌসুমে অনেকেই দিন-রাত এক করে ধান কাটছেন। শ্রমিক সংকট এবং পানির চাপের কারণে কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ছুয়াব আলীর মৃত্যু সেই বাস্তবতারই করুণ উদাহরণ।

এদিকে ছুয়াব আলীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা তার বাড়িতে ভিড় করেন। পরিবারের সদস্যদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা জানান, তিনি ছিলেন শান্ত স্বভাবের ও পরিশ্রমী মানুষ। এলাকার সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ হাওরাঞ্চলের কৃষকদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু ফসল রক্ষা নয়, কৃষকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘমেয়াদে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সুরক্ষায় আরও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে প্রতি বছর একই ধরনের দুর্ভোগের শিকার না হতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য আগাম বন্যা মোকাবিলায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ, দ্রুত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং আধুনিক কৃষি সহায়তা জরুরি। একই সঙ্গে দুর্যোগকালীন সময়ে কৃষকদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সহায়তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ ফসল রক্ষার লড়াইয়ে জীবন হারানোর মতো ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো কৃষি ব্যবস্থার সংকটকেই সামনে নিয়ে আসে।

ছুয়াব আলীর মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, হাওরের কৃষক শুধু ফসল ফলান না—প্রতিটি মৌসুমে প্রকৃতির সঙ্গে এক কঠিন যুদ্ধও করেন। কখনও সেই যুদ্ধে তারা ফসল হারান, কখনও হারিয়ে যায় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষটিও।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

‘আমি অরিজিনাল জাত কৃষক’ বললেন কৃষিমন্ত্রী

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

অপহরণের পর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের মরদেহ হবিগঞ্জে উদ্ধার

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দুই মন্ত্রী

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কমলগঞ্জে টিলা কেটে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

২০ বছর পর ডাকাতি মামলায় ১৩ জনের যাবজ্জীবন

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

‘আমি অরিজিনাল জাত কৃষক’ বললেন কৃষিমন্ত্রী

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

অপহরণের পর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের মরদেহ হবিগঞ্জে উদ্ধার

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দুই মন্ত্রী

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কমলগঞ্জে টিলা কেটে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

২০ বছর পর ডাকাতি মামলায় ১৩ জনের যাবজ্জীবন

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাবিপ্রবিতে টানা ২৯ দিনের ছুটি ঘোষণা

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে নতুন ডিআইজি জিললুর রহমান

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

স্বাস্থ্যসেবা চলবে, চাকরিও থাকবে: সিসিক

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ