প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
“মনকে সান্ত্বনা দেই, ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনি”—কথাগুলো বলতে বলতে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার আতুকুড়া গ্রামের কৃষক ফজর আলী। তার চোখের সামনে পচে যাচ্ছে বছরের একমাত্র সম্বল। খলায় পড়ে থাকা ভেজা ধানে গজাতে শুরু করেছে চারা। জমির বাকি ধান তলিয়ে গেছে পানির নিচে। সামনে কীভাবে চলবে সংসার, কীভাবে শোধ হবে ধারদেনা—এই অনিশ্চয়তা এখন তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবারের বোরো মৌসুম যেন কৃষকের জন্য এক নির্মম দুঃস্বপ্ন হয়ে এসেছে। কয়েক মাসের পরিশ্রম, ঋণ করে কেনা সার-বীজ, দিনরাত মাঠে কাটানো সময়—সবকিছু মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিচ্ছে অবিরাম বৃষ্টি আর আগাম পানি। জেলার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় এখন শুধু ধানডোবা মাঠ আর কৃষকের দীর্ঘশ্বাস।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় শুরুতে ফলনের সম্ভাবনাও ছিল আশাব্যঞ্জক। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। পাকার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে ধান। কোথাও আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা চলছে, কোথাও পুরো ক্ষেত ডুবে গেছে পানিতে।
সরকারি হিসাব বলছে, এখনো প্রায় ৮৪ হাজার ৮৫৭ হেক্টর জমির ধান মাঠে রয়েছে। মাত্র ৩৮ হাজার ২৯৪ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ২৭ হাজার ৪৬৫ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ১০ হাজার ৮২৯ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের মতে, বাস্তবে ১০ থেকে ১১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান ডুবে গেছে এবং প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে বানিয়াচং উপজেলা। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখানে প্রায় ২ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। এছাড়া আজমিরীগঞ্জে ১ হাজার ৭২০ হেক্টর এবং লাখাই উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে।
আতুকুড়া গ্রামের কৃষক ফজর আলী জানান, তিনি প্রায় সাড়ে ছয় একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। জমিতে পানি ওঠা শুরু হলে আধাপাকা অবস্থায় ধান কাটতে বাধ্য হন। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেই ধানও শুকাতে পারেননি। মাড়াই করে খলায় রাখার পর সেগুলো পচতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, “ভেজা ধান কেউ কিনতে চায় না। যেগুলো বিক্রি করার চেষ্টা করেছি, সেগুলোরও দাম নেই। এখন খলায় পড়ে ধানে চারা গজাচ্ছে। সব শেষ হয়ে গেছে।”
একই গ্রামের কৃষক মোতাব্বির মিয়ার কণ্ঠেও হতাশা। ধারদেনা করে প্রায় সাড়ে সাত একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন তিনি। কিন্তু আগাম বৃষ্টিতে কাঁচা ধান কাটতে বাধ্য হন। মাত্র সাত কেদার জমির ধান তুলতে পারলেও বাকিগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। কাটা ধানও নষ্ট হওয়ার পথে। তিনি বলেন, “ঋণ শোধ করা তো দূরের কথা, এবার পরিবারের খাবার জোগানোই কঠিন হবে।”
সুবিদপুর গ্রামের কৃষক হরেন্দ্র সরকার জানান, চার বিঘা জমিতে ধান আবাদ করতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। এখন সেই জমি পানির নিচে। তিনি বলেন, “আমার সব স্বপ্ন পানিতে ডুবে গেছে। সামনে কীভাবে চলবো, বুঝতে পারছি না।”
শুধু কৃষক নয়, ধান কাটার শ্রমিকরাও বিপাকে পড়েছেন। বানিয়াচংয়ের শ্রমিক সাহাব উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন দেড় হাজার টাকা মজুরিতে ধান কাটতে গেলেও বজ্রপাত আর জোঁকের ভয়ে মাঠে নামতে আতঙ্ক কাজ করছে। অনেক সময় বৃষ্টির মধ্যে কাজ করতে গিয়ে জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় বাজারে ধান ব্যবসায়ীরাও সংকটে। আতুকুড়া বাজারের ব্যবসায়ী রইছ আলী বলেন, সরকারিভাবে ভেজা ধানের মূল্য নির্ধারণ না থাকায় কম দামে কিছু ধান কিনেছিলেন। কিন্তু এখন সেই ধানও বিক্রি করতে পারছেন না। মিল মালিকরা ভেজা ধান নিতে চাইছেন না। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করাও সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, “ধান কিনেই বিপদে পড়েছি। আর কিছুদিন গেলে এগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।”
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ দ্বীপক কুমার পাল জানান, একদিন বিরতির পর শুক্রবার রাত থেকেই আবার ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে আরও প্রায় ৫ হাজার হেক্টর নতুন জমি তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে আগাম বন্যা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি.এম. সরফরাজ বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে। তিনি জানান, বৃষ্টিপাত আরও বাড়লে আগাম বন্যার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছরই হাওরাঞ্চলে আগাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ফসলহানির ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। কৃষকদের দাবি, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ক্ষতিপূরণ, কৃষিঋণ মওকুফ এবং বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় হাজার হাজার পরিবার ভয়াবহ খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে।
হবিগঞ্জের হাওরজুড়ে এখন শুধু পানির শব্দ নয়, শোনা যাচ্ছে কৃষকের হাহাকারও। যে মাঠে কয়েকদিন আগেও সোনালি ধানের ঢেউ ছিল, সেখানে এখন থৈ থৈ পানি। আর সেই পানির দিকে তাকিয়ে কৃষকরা শুধু একটাই কথা বলছেন—“ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনিই।”


