প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ফজরের নামাজরত অবস্থায় এক বৃদ্ধকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় এলাকায় চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মসজিদের ভেতরে সিজদারত অবস্থায় হামলার শিকার হন ৮০ বছর বয়সী হাফিজ উল্লাহ। ধর্মীয় উপাসনালয়ের মতো পবিত্র স্থানে এমন ভয়াবহ ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে জসিম মিয়া নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রোববার ভোরে উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের পশ্চিম লইয়ারকুল জামে মসজিদে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত হাফিজ উল্লাহ পশ্চিম লইয়ারকুল গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয়ভাবে তিনি একজন শান্ত স্বভাবের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ভোরে ফজরের নামাজ আদায় করতে মসজিদে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নামাজের মধ্যেই ঘটে যায় মর্মান্তিক এই ঘটনা।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, মুসল্লিরা যখন ফজরের নামাজে মগ্ন ছিলেন, তখন হঠাৎ এক ব্যক্তি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে। সে সরাসরি সিজদারত অবস্থায় থাকা হাফিজ উল্লাহর ওপর হামলা চালায়। হামলাকারী একটি বলপেন দিয়ে বৃদ্ধের চোখ, মুখ ও মাথায় এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। আকস্মিক এ হামলায় মসজিদের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুসল্লিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুরুতর আহত হন হাফিজ উল্লাহ।
পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পরপরই পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্ক নেমে আসে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এমন নৃশংসতা তারা আগে কখনও দেখেননি।
পুলিশ জানায়, ঘটনার পরপরই শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন জসিম মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বয়স প্রায় ৩০ বছর। তিনি স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা বলেও জানা গেছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে পুলিশ জানতে পেরেছে, ঘটনার আগের দিন নিহত হাফিজ উল্লাহর দোকানে বাকিতে মালামাল নিতে গিয়েছিলেন অভিযুক্ত জসিম। কিন্তু বাকি না দেওয়ায় তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পুলিশ বলছে, এখনো ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সজিব চৌধুরী বলেন, ঘটনার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। বাকিতে পণ্য না দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে কাজ চলছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিহত হাফিজ উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ছোট একটি দোকান পরিচালনা করতেন। বয়সের ভার থাকলেও নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এবং সবার সঙ্গে সদাচরণ করতেন। তাকে হত্যার ঘটনায় এলাকাবাসী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলছেন, মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে এমন ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিকতার ওপরও আঘাত।
ঘটনার পর পশ্চিম লইয়ারকুল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত বিচার এবং দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, এমন ঘটনা যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া পার পেয়ে যায়, তাহলে সমাজে ভয়ঙ্কর বার্তা যাবে।
একজন স্থানীয় মুসল্লি বলেন, ফজরের নামাজের সময় সবাই ইবাদতে ব্যস্ত ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ চিৎকার শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে যান। তিনি বলেন, একজন বৃদ্ধ মানুষকে সিজদারত অবস্থায় আঘাত করা অত্যন্ত অমানবিক ও নৃশংস ঘটনা। এখন মানুষ মসজিদেও নিরাপদ নয়—এই ভয় কাজ করছে সবার মধ্যে।
সামাজিক বিশ্লেষকরাও ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে সহিংসতা বেড়ে যাওয়া সমাজের জন্য অশনিসংকেত। মানুষের মধ্যে সহনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা হিসেবে সহিংসতা বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার মতো ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তা ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে আসে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযুক্তের মানসিক অবস্থা, পূর্বের আচরণ এবং ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নিহত হাফিজ উল্লাহর পরিবারে চলছে শোকের মাতম। স্বজনরা বলছেন, সামান্য একটি বিষয় নিয়ে এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড তারা কল্পনাও করতে পারেননি। পরিবারের সদস্যদের দাবি, হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।
মসজিদের ভেতরে নামাজরত অবস্থায় একজন বৃদ্ধকে হত্যার এই ঘটনা শুধু শ্রীমঙ্গল নয়, পুরো মৌলভীবাজার জেলাজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মানুষের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন—কতটা ক্ষোভ বা নিষ্ঠুরতা থাকলে একজন মানুষ সিজদারত বৃদ্ধের ওপর এমন বর্বর হামলা চালাতে পারে?


