প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল শাল্লায় টানা চার দিনের ভারী বর্ষণ ও কালবৈশাখী ঝড় জনজীবনে ভয়াবহ দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। একদিকে হাওরের বিস্তীর্ণ বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে, অন্যদিকে ঝড়ে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ায় চার দিন ধরে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে উপজেলা সদরসহ আশপাশের এলাকা। কৃষকের ঘরে তোলার অপেক্ষায় থাকা সোনালি ধান এখন পানিতে ডুবে নষ্ট হওয়ার পথে। আর যেসব ধান কেটে ঘরে আনা হয়েছে, সেগুলোও রোদ না থাকায় শুকাতে না পেরে পচে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে শাল্লার কৃষক ও সাধারণ মানুষের চোখে এখন হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছাপ।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের আশায় তারা সারাবছরের সঞ্চয় ও ঋণের টাকা খরচ করে জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। কিন্তু মৌসুমের একেবারে শেষ সময়ে এসে টানা বৃষ্টি তাদের স্বপ্নকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অনেক হাওরে পানি জমে অর্ধেকের বেশি ধান তলিয়ে গেছে। কেউ কেউ ধান কাটতে পারলেও রোদ না থাকায় মাড়াই করা ধান শুকাতে পারছেন না। ফলে ধানে অঙ্কুরোদগম শুরু হয়েছে, অনেক জায়গায় খড়ও পচে যাচ্ছে।
শাল্লা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় প্রায় ২১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছিল। সেখান থেকে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৬৮ মেট্রিক টন ধান এবং প্রায় ৯৫ হাজার ৫৭৯ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৫১৬ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকেই অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি শুরু হয়।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিলের আগেই প্রায় ৪ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়েছিল। এছাড়া শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টিতে আরও ৭৭১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্তত ১৬৭ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। নতুন করে গত চার দিনের টানা বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন হাওরে আরও প্রায় ১ হাজার ৪১৫ হেক্টর জমির বোরো ধান আক্রান্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
শাল্লা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিত রায় বলেন, টানা ভারী বর্ষণের কারণে নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে অনেক হাওরের পাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে। ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে কৃষি বিভাগ কাজ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
বাহাড়া হাওরের কৃষক মৃণাল কান্তি দাস জানান, তিনি ৩০ কেয়ার জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র ১০ কেয়ারের ধান কাটতে পেরেছেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও রোদের অভাবে সেই ধান ও খড়ও ঠিকভাবে শুকাতে পারছেন না। অনেক জায়গায় ধান পচে যাচ্ছে। বাকি ২০ কেয়ারের ধান এখন পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, বছরের একমাত্র ফসল নষ্ট হয়ে গেলে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবেন, তা ভেবে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
একই ধরনের কষ্টের কথা জানান শাসখাই এলাকার কৃষাণী শিবানী রানী। তিনি বলেন, ৮ কেয়ার জমির মধ্যে ৩ কেয়ারের ধান কাটা হয়েছিল। কিন্তু রোদ না থাকায় সেই ধানেই চারা গজাতে শুরু করেছে। আর একদিন এভাবে থাকলে পুরো ধান ফেলে দিতে হবে। বাকিগুলো এখনো পানির নিচে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য শুধু ধান নয়, গবাদিপশুর খাদ্য নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে। খড় ভিজে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার পশুখাদ্যের সংকটে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতার কারণে গরুর খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ সংকট। গত ২৬ এপ্রিল বিকেলে কালবৈশাখী ঝড়ে দিরাই-শাল্লা বিদ্যুৎ লাইনের অন্তত ২০টি খুঁটি ভেঙে পড়ে এবং অনেক খুঁটি কাত হয়ে যায়। এর পর থেকেই শাল্লা উপজেলা সদরসহ আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে মোবাইল নেটওয়ার্কও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চার দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
শাল্লা উপজেলা সদরের ঘুঙ্গিয়ারগাঁও, ডুমরা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন কার্যত অন্ধকারে ডুবে আছে। অনেক মোবাইল টাওয়ার বিদ্যুৎ না থাকায় বন্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন জেনারেটর ব্যবহার করে সীমিত কার্যক্রম চালালেও সাধারণ মানুষ তেমন কোনো বিকল্প সুবিধা পাচ্ছেন না।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, হাওরে জলাবদ্ধতায় কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শুধু মাঠের ধান নয়, কাটা ধান ও খড়ও নষ্ট হচ্ছে। প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে থাকার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রশাসনিক কাজও ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি কাজ জেনারেটর চালিয়ে করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাসেল আহমদ জানান, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত খুঁটিগুলো মেরামতের কাজ চলছে। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কাজ কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী দুই একদিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, হাওরাঞ্চলে প্রতি বছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকের জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। একদিকে আগাম বন্যা, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও ঝড়—সব মিলিয়ে কৃষকেরা চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তাই শুধু ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে হাওর রক্ষা বাঁধ, আধুনিক ধান সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে শাল্লার মানুষ এখন কঠিন সময় পার করছেন। মাঠে তলিয়ে যাচ্ছে সোনালি ধান, ঘরে শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে কাটা ফসল, বিদ্যুৎহীনতায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও সাধারণ মানুষের একটাই প্রত্যাশা—দ্রুত সরকারি সহায়তা ও কার্যকর উদ্যোগ।


