প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় শুক্রবার টানা আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার ঘোষণা দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। উন্নয়নমূলক কাজের অংশ হিসেবে সুরমা নদীর রিভার ক্রসিং লাইনে নতুন সার্কিটের তার সংযোগ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তাহিরপুর উপজেলার আওতাধীন সব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রকাশিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেন পল্লী বিদ্যুতের তাহিরপুর সাব-জোনাল অফিসের সহকারী ম্যানেজার আলাউল হক সরকার। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই কাজ পরিচালনা করা হবে। কাজটি সম্পন্ন করতে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই বলেও উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাহিরপুর উপজেলার অধিকাংশ মানুষ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। আবাসিক ব্যবহার ছাড়াও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কৃষিকাজ এবং ক্ষুদ্র শিল্প কার্যক্রমেও বিদ্যুৎ এখন অপরিহার্য অংশ। ফলে দীর্ঘ আট ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘোষণায় সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ উন্নয়নমূলক কাজের প্রয়োজনীয়তা মেনে নিলেও, অনেকে সম্ভাব্য দুর্ভোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিশেষ করে তীব্র গরমের এই সময়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে পারেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ। তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যেই গরমের তীব্রতা বেড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যান, পানির মোটর, ইন্টারনেট সংযোগসহ নানা প্রয়োজনীয় সেবা বন্ধ হয়ে যাবে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সাময়িক স্থবিরতা নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাহিরপুর বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে যেসব দোকানে ফ্রিজ, ফ্রিজার বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার রয়েছে, তাদের বাড়তি সমস্যার মুখে পড়তে হবে। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন এবং ইন্টারনেটনির্ভর ব্যবসাগুলোতেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে।
স্থানীয় কৃষকরাও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। বর্তমানে অনেক কৃষক সেচ ও কৃষিযন্ত্র পরিচালনায় বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। যদিও বিদ্যুৎ বন্ধের সময়সীমা আগেই জানানো হয়েছে, তারপরও হঠাৎ প্রয়োজন দেখা দিলে কৃষিকাজে সাময়িক সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের মাঝেও এ নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা দেখা গেছে। কারণ বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা, পরীক্ষার প্রস্তুতি ও বিভিন্ন ডিজিটাল কার্যক্রমে বিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শুক্রবার অনেক শিক্ষার্থী ঘরে বসে পড়াশোনা ও অনলাইন ক্লাসের প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই সাময়িক অসুবিধার পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা। সুরমা নদীর রিভার ক্রসিং লাইনে নতুন সার্কিটের তার স্থাপনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন ছাড়া ক্রমবর্ধমান গ্রাহক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছেন তারা।
সহকারী ম্যানেজার আলাউল হক সরকার বলেন, উন্নয়নমূলক কাজের কারণে সাময়িক এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটবে। এতে সাধারণ মানুষের সাময়িক অসুবিধা হলেও ভবিষ্যতে এর সুফল পাওয়া যাবে। তিনি এলাকাবাসীর কাছে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম সফল করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, আগাম বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ফলে মানুষ অন্তত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেকেই ইতোমধ্যে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে মোবাইল চার্জ, পানির সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় কাজ আগেভাগে শেষ করার পরিকল্পনা করছেন। কেউ কেউ ছোট জেনারেটর বা সৌরবিদ্যুতের ওপরও নির্ভর করার কথা ভাবছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য মাঝেমধ্যে এমন সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবে উন্নয়ন কাজ দ্রুত ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো যায়। একই সঙ্গে আগাম তথ্য জানানো এবং জরুরি সেবা খাতগুলোকে প্রস্তুত রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ অঞ্চলে নতুন সংযোগ, সঞ্চালন লাইন উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো অনেক এলাকায় মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সার্কিট সংযোগের কাজ সম্পন্ন হলে তাহিরপুর অঞ্চলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
এদিকে বিদ্যুৎ বন্ধ থাকার ঘোষণার পর স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাতেও যেন বড় ধরনের সমস্যা না হয়, সে দিকেও নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে উন্নয়নমূলক এই কাজকে ভবিষ্যতের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। যদিও এক দিনের জন্য দীর্ঘ আট ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করবে, তবুও উন্নত সেবার আশায় সেই সাময়িক কষ্ট মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাহিরপুরবাসী।


